গল্প: চানাচুর বিষয়ক গবেষণা

আমি একজন সামাজিক গবেষক, বিবিধ আমার গবেষণার বিষয়-আশয়। আমার যিনি সুপারভাইজার, তিনি প্রখ্যাত গবেষক, তার গবেষণার ছোটখাট বিষয়াদি নিয়ে আমি স্বত্যন্ত গবেষণা করে থাকি ফাকেঁ জোকে। সম্প্রতি তিনি আমাকে মানবিক আচরণ ব্যাখ্যায় চানাচুরের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করতে বলেছেন, তিনি আমার আরেক সহকর্মীকে লইট্যা শুটকির প্রভাবের কথা বলেছেন। তবে আমি খুশি যে আমার ভাগে চানাচুর পড়েছে, আমি চানাচুরের কিছুটা ভক্ত। এই নতুন গবেষণার ব্যাপারটা বলবার পর থেকে আমার সুপারভাইজারের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। কী অসাধারণ তার প্রজ্ঞা, কতই না ঋদ্ধ- বিদগ্ধ তিনি। এটা নিয়ে এতদিন কেন গবেষণা হয়নি সেটা ভেবে আমি আশ্চর্যান্বিত হলাম।

তিনি গবেষণার ব্যাপারে কয়েকটি হিন্টস দিয়েছেন আমাকে। বলেছেন- লক্ষ রাখবে, যে লোকটি সামনে পেয়েও চানাচুর খেল না, সে সংযমকারী বা স্বাস্থ্য-সচেতন। জানো তো চানাচুর পেটের জন্য অতটা ভাল না।
কথাটা বলার সময় অবশ্য আমরা দু'জনাই মুঠ মুঠ চানাচুর চিবোচ্ছিলাম। সাতক্ষীরার বলরামপুরের করিম শেখের নিজের হাতে বানানো চানাচুর, চানাচুরের বাদামও তার নিজ ক্ষেতের, বঙ্গপসাগরের লবণে ভাজা। গবেষণার জন্য ত্রিশ কেজি আনা হয়েছে অর্ডার দিয়ে, আমরা সেটা যাচাইও করছিলাম বলা যায়।
তিনি আবার বললেন, চানাচুর খাবার সময় যে লোকটি বাদাম বেছে খেয়ে নিল, সে স্বার্থপর।
আমার হাতে তখন দুটো বাছা বাদাম ছিল, আমি বুড়ো আঙ্গুল কনিষ্ঠ আঙ্গুলের দিকে প্রসারিত করে বাদামদুটো গুজেঁ ফেললাম।
চানাচুরের সাথে আমার বস একদুই চুমুক হুইস্কি খাচ্ছিলেন। আমার হাতেও এক গেলাশ ছিল, আইস দেয়া। কিন্তু খাচ্ছিলাম না, কারন নেশা হলে আমি খুব গালিগালাজ করি, প্রধান গবেষককে গালি দিলে তিনি চাকরি থেকে খেদিয়ে দিতে পারেন, তখন আমার বুড়ো বাপ আর মা, আর সুন্দরী স্ত্রী নিয়ে আমি বড় বিপদে পড়ে যাব।
তিনি আবার বললেন, চানাচুর মুঠ মুঠ করে খাওয়া ছোটলোকি।
আমি আমার মুঠোতে থাকা চানাচুর প্লেটে কিছুটা রেখে সাফাই গেয়ে বললাম, স্যার, শিশুরাও মুঠ মুঠ চানাচুর খায়। আমার ছোট এক ভাই ছিল, চার বছর বয়সে বিরিশপুরের বিলের পানিতে ডুবে মারা যায়, শাপলা পাতার পাশে ভেসে উঠছিলো হাসি হাসি মুখে, সেও মুঠ ভর্তি চানাচুর খেত।
তিনি বিরক্ত হয়ে বলল, শিশুরাও ছোটলোক, এটা নতুন করে বলার কি আছে! এ বিষয়ে উননিশশো চুয়াত্তরে আমার একটা গবেষণা ছিল, স্টাডিরুমে আছে, সময় পেলে দেখো। দুর্ভিক্ষের সময় শিশুরা মৃতপ্রায় মায়ের শেষগ্রাসও কেড়ে নেয়।
কথাটায় হঠাৎ আমার পেটে পাক দেয়, কেন যেন বিবমিষা হয়।
তিনি আবার বললেন, চানাচুর যে তাড়াতাড়ি খায় সে নিরাশাবাদী!
আমি বললাম, এর ব্যাখ্যা কি?
ওই বেলা সে এরচেয়ে ভাল কিছু আশা করেনা।তাই চানাচুরে পেট ভরাতে সচেষ্ট সে।
আমি বললাম, তাহলে যে ধীরে খায় সে আশাবাদী।
তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, বাজে কথা রাখো। সে বিষাদগ্রস্থ। বিষাদের নিস্পৃহতা ছাড়া কে কবে চানাচুর ধীরে খায়!
বস হুইস্কিতে আরেক চুমুক দিয়ে বললেন-এই বেলা যাও! মতিপুরের জনপদে চানাচুরের প্রভাব প্রত্যক্ষ করে এস। এককেজি তো যাচাই করতেই খরচ হল। বাকি উনত্রিশ কেজি চানাচুর নিয়ে আজই তুমি ট্রলারে উঠবা। ঠিকঠাক সার্ভেটা করে আসো।
আমি তাকে বিদায় জানিয়ে তক্ষুনি বেড়িয়ে পড়লাম, গবেষণাটা হওয়া উচিত দ্রুত। চানাচুর কোম্পানীরা আমাদের এই গবেষণার তথ্য-উপাত্ত সোনার দামে কিনে নেবে, নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করবে। চানাচুরের ব্যাগ পিঠে নিয়ে আমি ট্রলার ঘাটে ছুটে গেলাম।



ট্রলারে করে রাত পার হয়ে মতিপুরে পৌছাই সকাল সকাল, যদিও সূর্য ওঠেনি, চারপাশে ঘোলা আলো আর কুয়াশা। গত পনেরদিন ধরে নাকি একই অবস্থা। মতিপুরে আগে একবার এসেছিলাম অন্য গবেষণায়, তখন গরুর গাড়িতে এসেছিলাম। এখন ট্রলার ছাড়া নড়বার-চড়বার উপায় নেই। স্বল্প বসনের কালো রঙা চাষাভুষা সব টিনের চালে ঘর পেতেছে। আমাকে দেখে ভাবলো, আমি রিলিফ নিয়ে এসেছি।
আমার গবেষণার স্বার্থে আমি প্রথম পরিবারকে দুইকেজি চানাচুর দিলাম এবং তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করলাম।
নোট করলাম- এই পরিবার স্বাস্থ সচেতন নহে!

আরেকটু সামনে গিয়ে দেখি এক টেলিভিশনের লোক, ঘরের চালের কালো রঙা স্বল্পবসনদের ফুটেজ নিচ্ছে, লোকটাকে আমি চিনতে পারলাম, খুব কামেল আদমী। যেখানেই স্বল্পবসন-হাড়বের করা মানুষ পাওয়া যায় সেখানেই গিয়ে গিয়ে ছবি তুলে। ট্রলার নিয়ে আমি তার ট্রলারের পাশে গেলাম এবং আমাদের আলাপ হল। আমার গবেষণার বিষয় তাকে অবহিত করলাম, তিনি উচ্ছ্বসিত হলেন। চানাচুরগুলো সাতক্ষীরার বলরামপুরের করিম শেখের নিজের হাতে বানানো আর বাদামও তার নিজের ক্ষেতের এবং বঙ্গপসাগরের লবণে ভাজা জেনে তিনিও গবেষণার স্বার্থে চানাচুর ভোজনে রাজি হলেন। আমরা তখন পরস্পরের ট্রলার পাশাপাশি রেখে এককেজি চানাচুর খেলাম। সেসময় আমি তার চানাচুর খাওয়া পর্যবেক্ষণ করলাম।
নোট নিলাম- লোকটি স্বার্থপর এবং আনন্দিত। তার চানাচুর গ্রহণ দ্রুতও নয়, ধীরও নয়।

এরপর কোনদিকে যাব সে সম্পর্কে আমি তার সাহায্য চাইলাম। তিনি হাতে লেগে থাকা চানাচুরের গুড়া কালো জিব বের করে চেটে নিয়ে বললেন, উত্তরদিকে গেলে একটা তালগাছ পড়ে। সেইটার ডানদিকে এক বিচ্ছিন্ন বেখাপ্পা বাড়ি আছে, ওইখানে কলেরায় ভুগে আর না খেয়ে বাড়ির এক মেয়ে মারা গেছে। কবর দেয়ার মত উঁচু জায়গা না পাওয়ায় তারা ব্যথিত। তাদের উপর আপনি গবেষণা পরিচালনা করতে পারেন।
আমি তার কথায় দিকপ্রাপ্ত হবার আনন্দ অনুভব করলাম এবং আমার ট্রলার নিয়ে শীঘ্রই পৌছালাম। পরিবারটিকে আমি চানাচুর দিলাম। এবং চানাচুর সংক্রান্ত তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করলাম।
নোট করলাম- এরা স্বাস্থ্যসচেতন, স্বার্থহীন এবং বিষাদগ্রস্থ।
এরপরে আমি আরো কয়েকটি পরিবারকে খুঁজে পেলাম এবং তাদের বাকি চানাচুর বিলি করে তাদের প্রতিক্রিয়া লিপিবদ্ধ করলাম।
সামগ্রিক ফলাফল দাঁড়াল- মতিপুরের অধিকাংশ পরিবারই স্বাস্থ্য-সচেতন নহে। তারা সকলেই নি:স্বার্থ। তাদের পঁচাশিভাগ ছোটলোক এবং নব্বই ভাগই নিরাশাবাদী।
আমি আমার রিপোর্ট নিয়া ট্রলারে করে ফিরতি পথে রওনা দিলাম।
ফেরার পথে, হঠাৎ মনে হল, এই মহৎ গবেষণার আমিও একটি সাবজেক্ট, আমি মতিপুরেই চানাচুর গ্রহণ করেছি। তাই আমার নামেও আমি নোট নিলাম।
-স্বাস্থ্য সচেতন, স্বার্থপর, ছোটলোক নহে, আনন্দিত।

চানাচুর জনিত আচরণবিধির এটি একটি স্বার্থক গবেষণা তা নিজের সম্পর্কে নোট নেয়ার পরই আমি হৃদয়ঙ্গম করলাম।
কারন, সফল গবেষণা সম্পন্নে আমি সত্যি ভীষণ আনন্দিত ছিলাম!

ইজেল ছেড়ে বেড়িয়ে আসা একঝাঁক কালো কবুতর (পর্ব ১)

গল্প
১.
আমার প্রেমিকা দাবি করেছিল আমার একটি ছিমছাম চাকুরি প্রয়োজন, নইলে সম্পর্কটা ঠিক জুতসই হচ্ছে না। ব্যাপারটা নিয়ে আমি ভাবিত হলাম, মেয়েটার উপর আমি কিছুটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি, সম্পর্কটা না টিকলে মুস্কিল। আমি বললাম, বাকিরা তো বলে আমার মাথা ঠিক নেই, ওরা যদি চাকরি না দেয়!
আলবৎ দেবে! ও আমাকে ভরসা দেয়। তোমার মাথাটা যে অমাবস্যার রাতে চক্কর দিয়ে ওঠে সেটা ওরা জানবে কিভাবে।
এটা ঠিক। এমনিতে আমি খুব ভাল মানুষ, কবিতার প্যাডে কবিতা লিখে জিন্সের প্যান্টের পিছনের পকেটে রেখে দিই আর কাউকে মনে ধরলে পাতা ছিড়ে কবিতা ধরিয়ে দেই। ব্যাপারটা দারুণ অমায়িক, এটা কয়েকজন আমাকে বলেছে। কিন্তু অমাবস্যার রাতে আমি কেমন দুলে উঠি, কবিতার প্যাডটা কেরোসিনের চুবিয়ে আগুনে দেই, ওটা যখন দাউ দাউ করে জ্বলে তখন একটা চিমটা দিয়ে ধরে প্রতিবেশী বাড়ির দাহ্য অংশে নিক্ষেপ করি। আবদুল বাতেন সাহেবের বড় মেয়ে নাজমার কামিজেও একদিন আগুন দিয়েছিলাম, মেয়েটার পয়ত্রিশ পার্সেন্ট পুড়ে গেছিলো, আর আমাকে জেল-হাজতে থাকতে হয়েছে পৌণে চারমাস। মেয়েটা দারুণ সুন্দরী ছিল, কামিজটা আরো সুন্দর ছিল।
লতিফা আমাকে পরেরদিন ভাল শার্ট-প্যান্ট পড়িয়ে চাকরি খুঁজতে পাঠাল, পত্রিকার একটা কাটিং হাতে নিয়ে নির্দিষ্ট একটা ঠিকানায় গিয়ে আমি হাজির হলাম। জায়গাটা খিলখেতের কাছাকাছি, চারতলা দালান। আমি গিয়ে রিসেপশনে বললাম, শুনুন, আমি কি আপনাকে একটি জরুরী প্রশ্ন করতে পারি?
রিসিপশনিস্ট মেয়েটা সুন্দর। চোখের চারপাশে ঘন করে কাজল দিয়েছে, তাতে চোখটার ডেপথ বেড়ে গেছে। পল্লবগুলো সুবিন্যস্ত, পাকা ধানের মাঠে হাওয়া বয়ে গেলে ধানগুলো যেমন একপাশে হেলে পড়ে তেমনি হেলে আছে। আমার মনে হল মেয়েটার চোখ-পল্লবে একটি লাল ফড়িং উড়ছে।
মেয়েটা বলল, আপনি কি আজ ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন?
আমি সেটার জবাব দিলাম না, মুখ শক্ত করে একপাশে এক চেয়ারে বসে পড়লাম। মেয়েটা আমাকে জরুরী প্রশ্ন-যেটা হয়তো ইন্টারভিউ সংক্রান্তই, সেটা করতে না দেয়ায় আমার খুব জেদ হল। আমার ইচ্ছা করছিলো তখনই দালান থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে যাই। কিন্তু তখন আমার আবার লতিফার কথা মনে পড়লো। লতিফা জামান, আমার প্রেমিকা, আমাকে খুব আগলে রেখেছে, ওর কথা না শুনলে ও আমাকে ছেড়ে যেতে পারে, তাতে আমি খুব অসহায় হয়ে যাব।
আমি আবার তাই রিসেপশনে ফিরে গিয়ে মেয়েটাকে বললাম, হ্যা আমি ইন্টারভিউ দিতে এসেছি। এটা কি নির্মলা ক্যাটারিং সার্ভিস?
মেয়েটা অমায়িক হাসল, বলল- জ্বী, এটাই। আপনি বসুন। খানিকবাদেই ডাকা হবে।
মেয়েটার চোখের পল্লবে এবার একটা কাকতাড়ুয়া দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম। কাকতাড়ুয়ার মাথায় একটা নীল হাড়ি বসানো। হাড়িতে কেউ চক দিয়ে চোখ-মুখ এঁকেছে।
আমি আমার সিটে গিয়ে বসলাম এবং লক্ষ্য করলাম আমার সাথে আরো কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী বসে আছে, এরা সবাই নিশ্চয়ই আমার লতিফা জামানের অনুগ্রহ প্রাপ্তিতে আমার প্রতিযোগী। আমার বামপাশে বসে আছে এক শীর্ণকায় যুবক, শার্টটা সস্তা, বহুবার ধোয়ায় বিবর্ণ, যুবকটি মৃদু স্বরে স্রষ্টাকে ডাকছে। এই যুবকটির চাকরি খুব প্রয়োজন সেটা দেখলেই বোঝা যায়-এর বাড়িতে নিশ্চয়ই খুব টানাটানি, চাল-ডাল জোটাতেই সমস্যা হয়, হয়তো ওর বাপ ধার-দেনায় জর্জরিত, পাড়ার মুদি দোকান এখন আর বাকিও দিতে চায় না, হয়তো ওর বাড়িতে এখন একবেলা হাড়ি চড়ে, ওর নিশ্চয়ই ছোট-ভাইবোন আছে-যারা ওর দিকে চেয়ে আছে যে একটা চাকরি পেলে খিদেয় আর কষ্ট করতে হবে না। লতিফা জামানের অনুগ্রহ প্রাপ্তির প্রতিযোগীতায় আমি এমন প্রতিদ্বন্ধী চাই না।
এই যুবকটির পাশে বসে আছে একটি কিশোর ছেলে। ছেলেটা অস্থির, এদিক ওদিকে তাকাচ্ছে, কানে একটা হেডফোন গোজা, হাতের মুঠোফোনে ফেসবুক ব্রাউজ করছে, টুং করে একটা আওয়াজ হল, মনে হয় কেউ মেসেজ করেছে- ছেলেটার মুখে দেখা গেল বাঁকা হাসি। আমার মনে হল, ছেলেটা ধুরন্ধর, ওর বাপ-মা কলেজের পড়াশোনা করতে বলে নিয়মিত কিন্তু পড়তে ওর ভাল লাগে না। এই নিয়ে রোজ হাঙামা হয় বলে ও বাড়ি ছেড়ে পালানোর ফন্দি করছে, এ সময় একটা চাকরি জুটে গেলে ওর পোয়াবারো, বুড়ো-বুড়িকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সটকে পড়া যাবে, ওর নিশ্চয়ই অল্পবয়সী কোন প্রেমিকা আছে, যে রোজ পালাতে উস্কানি দেয়। লতিফা জামানের অনুগ্রহ প্রাপ্তিতে আমি এই ছেলেটিকেও প্রতিদ্বন্ধী হিসেবে চাই না।
এরপরে বিক্ষিপ্তভাবে আরো কয়েকজন বসে ছিল। তাদের আমি ভালমত লক্ষ করতে পারলাম না, কারন নিখুঁতভাবে দেখার মত দূরত্বে তারা কেউ ছিল না।
এরপর একজন একজন করে ডাক পড়তে লাগলো। আমার সিরিয়াল পিছনের দিকে ছিল, তাই আমি বসে বসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ভাবছিলাম। আমার ভাবনার বড় অংশ, প্রায় সত্তরভাগ জুড়ে অবশ্য লতিফা জামানই থাকে, তারপরও বাকি ত্রিশ ভাগ ভাবনা আমি ভেবে রাখি নিয়মিত। যেমন, আমি আমার মাথায় তৈরিকৃত দ্বীপ অরোরা ল্যান্ড নিয়ে ভাবি। অরোরা নামটা কেন আমার মাথায় আসলো সে সম্পর্কে আমার ধারণা নাই। তবে এই দ্বীপটা আমি তিলে তিলে তৈরি করেছি। দ্বীপের প্রত্যেকটা ঘর আমার নিজ হাতে তৈরি। দ্বীপে কিছু মানুষ ও পশুপাখি আছে,বৃক্ষ আছে। সেগুলোও আমার আমদানি করা। যেমন গত মার্চ মাসে আমি উপকূলে পাইন গাছ লাগিয়েছিলাম, সেগুলো এখনো বড় হয় নাই। নার্সারির লোকটা আমাকে বলেছে পাইন গাছ বড় হতে একবছর লাগে।
আমার এই দ্বীপটার কথা লতিফা জানে, আর কেউ জানে না। আমার স্কুলের এক বন্ধু জানতো, নাম মিফতাহ। মিফতাহর সাথে দেখা হলে ও দ্বীপের ঘরবাড়ি ওলট পালট করে দিত, বলতো- দ্বীপের মাঝখানে একটা মিঠা পানির হাওর রাখ, তাহলে ভাল হবে। হাওরের পাড় ঘেষে বৈচির ঝোপ-জলে মেঘের ছায়া আর শাপলা পাতা, হাওয়া উঠলে পানি কাপে তিরতির করে। মিফতাহ এমন করে বলতো যে আমি না চাইলেও দ্বীপে হাওরটা বসে গেল। এইভাবে নানা কিছু পরিবর্তন করছে ও। গত বছর বাস এক্সিডেন্ট করে মারা যায় মিফতাহ। তখন আমি স্বস্তি পেয়েছিলাম, কারন দ্বীপটার কথা আর কেউ জানুক এটা আমি চাই না। লতিফা জানলেও লতিফা দ্বীপ নিয়ে মাথা ঘামায় না। শুধু একদিন বলেছিল, ‘আমারে রাইখো তোমার দ্বীপে!’
আমি রাখি নি। কারন আমার দ্বীপের বাসিন্দারা কেউ বাস্তব জগতে জীবিত না। এটা অবশ্য লতিফা জানে না। যেমন মিফতাহ মারা যাবার পরদিন মিফতাকে আমি দ্বীপের একটা ঘর দিয়েছি, তাতে ও খুশি হয়েছে। এমনি করে আমার বাপ-মা, ছোটভাইও দ্বীপের বাসিন্দা। আমি ওদের সবচেয়ে ভাল ঘরটায় রাখছি, কারন আমি ফ্যামিলি ম্যান, ফ্যামিলি আমার কাছে সবার আগে।
দ্বীপ নিয়ে ভাবনায় ছেদ পড়লো, সুন্দরী রিসিপসনিস্ট আমাকে বলল, আপনার ইন্টারভিউ শুরু হবে এখন, আপনি ওই রুমে যান।
আমি রিসিপসনিষ্ট এর চোখের পল্লবে এবার জারুলফুলের ঘন স্তবক দেখলাম, এই মেয়েটার চোখটা খুব চঞ্চল, খানিক পরপরই পাল্টে যাচ্ছে।

ইন্টারভিউ বোর্ডে দুইজন বয়স্ক লোক আর একজন বয়স্ক মহিলা ছিলেন। তারা আমার সম্পর্কে নানা কথা জিজ্ঞেস করলেন। আমার মনে হল তাদের আগ্রহ সীমাহীন। আমি কেন ফাইন আর্টসে একবছর পরে আর পড়াশোনা করিনি সেটা নিয়ে তারা বিশেষ উৎসুক হলেন। আমি তাদের কারনটা বললাম। তারা মেনে নিলেন। নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে কথা বললেন। আমি যে শুধুমাত্র একটা ছবিই একহাজার সত্তর বার এঁকেছি ব্যাপারটায় তারা হয়তো কিছুটা বিস্মিত হয়েছে এবং এই কারনেই ফাইন আর্টসের টিচাররা আমাকে রাখতে রাজি হয় নাই এটায় তারা হয়তো বিস্মিত হয় নাই। কিন্তু আমার মতে দ্বিতীয় কথায় তাদের বিস্মিত হওয়া উচিত ছিল। আমার মতে, একজন আর্টিস্টের একটা ছবিই আঁকা উচিত নানা ভাবে, হাজার হাজার ছবি এঁকে কি লাভ।
তারা আমার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তারা যে সবাই সমুদ্রপাড়ে ট্যুরে ঘুরতে গিয়ে মারা গেছে এটা জেনে তাদের মুখে সামান্য ভাবান্তর হল। আমার পরিবারের মধ্যে কেবল আমি বেঁচে গেছি এটা জেনে তারা বিব্রত হল ।
এরপর তারা আমাকে তাদের কাজের ধরণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিলেন এবং সেসব আমি করতে পারবো কিনা জানতে চাইলেন। আমি কাজটা পছন্দ না করলেও মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম যে কাজটা আমি পারবো। এরপরে আমার ইন্টারভিউ শেষ হল। আমি দালান থেকে বেড়িয়ে লতিফার ফ্লাটের পথ ধরলাম।

( চলবে)

পিত্ত আর কাশির ব্যামোয় ধরবে হলুদ রঙ

গল্প

জলার ধারে এক ফড়িং বসে ঝিমাচ্ছিল। চোখ ওর বড় বড় আর টলটলে সবুজ, ঠিক যেন পালিশ করা স্ফটিক। বসেছিল এক হিজল গাছের পাতার ডগায়, উত্তরা বাতাসে দুলছিল পাতাটা। এই দোলাদুলি ফড়িংটার ভালো লাগে -তাই এইখানে বসে থাকে ফড়িংটা খুব। এই ফড়িংয়ের নাম অহরু। অহরু একটু ধীরস্থির, অত চটপটে নয়, খলবলিয়ে উঠা ওর স্বভাববিরুদ্ধ।

অহরুর বাবা, নাম তার কহরু, সেও এক মস্ত সবুজ চোখা লোক। এসে বলে,

‘হ্যারে, তুই দেখছি ভারী অলস, তুই তো একদম...একদম যাচ্ছেতাই। এতক্ষণ কেউ হিজল গাছে বসে থাকে, একেবারে যাচ্ছেতাই তো!

কহরুর দোস্ত এক ভ্যানভেনে মাছি সেও এসেছে কহরুর সাথে অহরুর ঝিমানো দেখতে। ভ্যানভেনিয়ে বলল,


নয়তো এটা ভালো

হিজল গাছের বিজল পাতায়

বসলে অমন-

ম্যাড়মেড়িয়ে উঠবে গা টা

খড়খড়াবে বুকের পাটা

পাখায় ধরবে জং

পিত্ত আর কাশির ব্যামোয়

ধরবে হলুদ রং!




হলুদ রং! অহরুর বাবা কহরু শিউরে উঠে। ‘ এতো ভালো কথা নয় বাবা,শিগগির চল, ওই জারুল গাছে গিয়ে বসি।

ভ্যানভেনে মাছি কিন্তু আবার বলে উঠে-


হিজল আর জারুল পাতা

সবই এক ছাতামাতা

আসল কথা অলসতা

খুব খারাপ-খুব খারাপ



ম্যাড়মেড়িয়ে উঠবে গা টা

খড়খড়াবে বুকের পাটা

পাখায় ধরবে জং

পিত্ত আর কাশির ব্যামোয়

ধরবে হলুদ রং!


অহরুর বাবা আবার শিউরে উঠে। হলুদ রং মোটেও ভাল নয়। তা তুই একটু অলস ঠিকই অহরু। খলবলিয়ে না উঠলে আমাদের ঠিক চলে না-বুঝেছিস। উড়ে আসি চট করে চল, পাখার জং কাটবে তখন।

অহরু কিন্তু বলে বসে, ‘অলস আমি নই মোটেও, বরঞ্চ আমার বন্ধুদের তুলনায় ভীষণ জোড়ে ছুটি। এত জোড়ে যে ওরা খুব বিরক্ত হয় আর বলে ‘ হয়েছে! অত ছুটিস না’

শুনে ভ্যানভেনে মাছি ভনভন করে হেসে উঠে-


ভ্যান ভ্যান ভং

খুব হয়েছে রং তামাশা

খুব হয়েছে ঢং

কানের নীচে দাও দুখানা

উপরে ঝুলাও পাও দুখানা

চিমটি কাটো নাকে

বন্দী করে রাখতে হবে

আলমারীটার তাকে!


‘তা তুই খুব বাজে বকছিস অহরু-সত্যি সত্যিই।’ কহরু বলে।

‘তোর এই মিনমিনিয়ে ছুটে বেড়ানো মোটেও চটপটতার মধ্যে পড়ে না। তোর দোস্তগুলো হয় কানা, নয় আস্ত...আস্ত’ কহরু ভাষায় কুলাতে পারে না।

‘না হয় আস্ত গবেট’ মাছি বলে দেয়।

অহরু এইবার ঝাঝিয়ে উঠে, ‘যাও হয়েছে! আমি আলসে আর আমার বন্ধুরা সব চালসে। হলো তো?’

কথা শুনে কহরু বলে,’ ছি! এমন অভিমানের কথা বলে না, অমন যাচ্ছেতাই অভিমানের কথা বলতে আছে! তারচেয়ে চল তোর বন্ধুদের গিয়ে দেখি!



তারপর তারা তিনজন মিলে রওনা দেয় জলার দিকে। টলটলে জলার মাঝে একখানি ঘাস আর শ্যাওলা মাখা ছোট্ট জায়গা। ঠিক যেন সাগরের মাঝে মাথা উচিয়ে পাথুরে দ্বীপ।ওখানে বসে ছিল এক থপথপানো কাছিম। অহরুরা যখন ওখানে আসে তখন কাছিমটা রোদে আরাম করছিল।

কাছিমের কাছে গিয়ে অহরু বলে-

‘ দেখ না কাছিম, ওরা বলে আমি নাকি অলস। অথচ তুই তো বলিস আমি নাকি ছুটে বেড়াই খুব , এবার আমার হয়ে সাফাই গা তো!

কথাটা বুঝতে কাছিমের সময় লাগে খানিকটা। তারপর ভেবে নিয়ে বলে-

‘উহু, তাতো নয় মোটে। ওর ওড়াওড়িতে খুব তাড়াহুরা, এত তাড়াতাড়ি ওড়াউড়ি খুব বাড়াবাড়ি। ঠিকমত ঠাহর করা যায় না ঘাড় ঘুড়িয়ে, আর অত অত ঘাড় ঘুড়িয়ে কথা বলা দারুন বিশ্রী।

শুনলে তো? অহরুর মুখ ল্যাপটালেপ্টি হাসিতে।

মাছি শুনে টুনে বলে-


কাছিম তোর যাচাই

হচ্ছে না তো মনের মত

শুনতে মোরা যা চাই,

নিজেই তুই এত্ত অলস

থ্যাপথেপিয়ে যেমনি চলস

রাস্তাটা পার হতে

লাগাস দুই ঘন্টা

এমনি করে গেলে

নেমন্তন্নে এলে

পাবি মেঠাই মন্ডা?


কাছিম বলে,মেঠাই মন্ডা আমি খাই না, তবে বলি আমি অলস নই মোটে, বরঞ্চ আমার বাকী বন্ধুদের তুলনায় খুব জোড়ে ছুটি।

শুনে মাছি ভনভন করে হেসে উঠে


ভ্যান ভ্যান ভং

খুব হয়েছে রং তামাশা

খুব হয়েছে ঢং


অহরুর বাবা বলে, না কাছিম এ তোর বাড়াবাড়ি। তোর চেয়ে ধীরে চলে এমন কোন লোক আছে বলে ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না, গুল মারছিস না তো!

‘ঠিক আছে ! আমিই সেরা অলস, হলো তো!”

‘ছি! এমন অভিমান করতে আছে! তারচেয়ে চল তোর বন্ধুদের দেখি গিয়ে।‘

তারপর ওরা চারজন রওনা দেয়, জলার কিনারায়। ওইখানে ভিজে মাটিতে, যেখানে ঘাসেরা আর শ্যাওলামাখা সবজেটে নুড়ি পাথর বিছিয়ে আছে, সেখানে গুড়ি মেরে বসে আছে এক ল্যাপলেপিয়ে শামুক।

কাছিম গিয়ে শামুকের কাছে ব্যাপারটা পাড়তেই শামুক বলে,

অলস তুই? মোটেও না। তোর মাথা খুব জোড়ে নড়ে, খোলসের ভেতর আসা যাওয়া করে তৎক্ষনাৎ।

মাছি বিরক্ত হয়ে শামুককে থামিয়ে দেয়-


শামুক তুই এত্ত অলস

ল্যাপলেপিয়ে যেমনি চলস

রাস্তাটা পার হতে

লাগাস এক হপ্তা

এমনি করে গেলে

নেমন্তন্নে এলে

পাবি মাছের কোপ্তা?




শামুক বলে,


‘ব্যাপারখানা নয়তো সোজা

বুঝতে ঠিকই, থাকতো যদি

ঘাড়ে এমন বোঝা।‘


মাছি বলে,


বোঝাটাকে থুয়ে

যাস না কেন বিদেশ বিঁভুয়ে




শামুক বলে,


বোঝা থুয়ে বাইরে যাওয়া!

লাগে যদি ঠান্ডা হাওয়া

ভাবলে আসে জ্বর

তারচেয়ে তোদের বুঝিয়ে বলি

বোঝাই আমার ঘর!!




তা ঠিক তা ঠিক, কহরু বলে, বোঝাই তো ওর ঘর, ওর বেশি নড়ে কাজ কী!

কাছিম বলে, খোলসও তো আমার ঘর। আমারও তাই বেশি ঘুরে কাজ নেই।

অহরুর বাবা এবার অহরুর দিকে ফিরে বলল, এবার বুঝলি তো। ঘরই লোকদের অলস করে দেয়। যারা জন্ম থেকেই ঘর নিয়ে থাকে তারা তো গোড়া থেকেই চটপটে নয়, আর যারা পরে ঘর বানিয়ে নেয় তারাও ভারী অলস হয়ে পড়ে। তাই ফড়িং হয়ে তোর এই আলসেমি সুবিধার না। ওদের সাথে মিলিয়ে তুইও অমন গদাই লস্করি চালে যদি চলিস তাহলে কিন্তু-

তাহলে কি হবে সেটা ভ্যানভেনে মাছি বলে দেয়-


ম্যাড়মেড়িয়ে উঠবে গা টা

খড়খড়াবে বুকের পাটা

পাখায় ধরবে জং

পিত্ত আর কাশির ব্যামোয়

ধরবে হলুদ রং!




হলুদ রং!! সবাই শিউরে উঠে।

বই: যদি একে রূপকথা বলি। অহনা বিশ্বাস

বই বইকি!
কবি ও লেখক অহনা বিশ্বাস বীরভূমের একটি আদিবাসী গ্রামে দীর্ঘদিন থেকেছেন, খুব কাছ থেকে তাদের একজন হয়ে দেখেছেন সাঁওতাল জীবন। সে অভিজ্ঞতারই নির্যাস যেন বইটি। বইটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ( একটা চ্যাপ্টার বাদে) একজন এক আদিবাসী নারীর বর্ণনায় নিজস্ব ভঙ্গিতে বলে যাওয়া। ঠিক যেন অহনা বিশ্বাস-কে শুনাচ্ছেন নিজ স্বপ্ন আর সংগ্রামের কথা, প্রেমের কথা, দিকুদের থেকে তাদের জীবন কতটা ভিন্ন সেসব কথা।
দিদি সম্বোধন করে অধ্যায়ের পর অধ্যায় সে বর্ণনা করে যায় তাদের জীবন, যে জীবন যতটা স্বাধীন আবার ততটাই শেকলে মোড়া, হান্ডি খেয়ে ওরা রাতের পর রাত মাতাল হয়ে পড়ে থাকে, টামাক বাজায় মনের আনন্দে, নদীর ধারে ঝিনুক কুড়াতে যায়, রকুইচন্দন গাছের শাখায় চাঁদ উঠলে গলা ছেড়ে গান গায়। পুরো পৃথিবীর সব আদিবাসীর মতই দিকুদের সাথে ওদের বিবাদ, দিকুরা ওদের ফরেস্ট গার্ড দিয়ে জমিজমা কেড়ে নেয়, ওদের এলাকায় হোটেল তোলে, সেখানে কাজের লোভ দেখিয়ে ওদের বেঁচে দেয়, পয়সা গছিয়ে জমিজমা কেড়ে নেয়। পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় নতুন নতুন গল্প, কোনটা দেবতা বোঙাকে দর্শনের ঘটনা, কোনটায় পাশের পাড়ার চাপলু বুড়োর কীর্তি, কখনো প্রেম-বিয়ে, এসব নিয়ে ওদের নিজস্ব ধ্যান-ধারনা যেটায় শ্রোতা অবাক হতে পারে ভেবে নিজ থেকেই বলা,‌' আমাদের অমন হয় দিদি!' তাদের সরল জীবনে কেউ কাউকে অবিশ্বাস করলে বোঙাথানে গিয়ে দেবতার নামে শপথ করে কথাটা বললেই সবাই মেনে নেয়, দশজনকে পেটপুড়ে হান্ডি খাওয়ালেই সবাই খুশি!
বিবেকানন্দ সাঁতরার ইলাস্ট্রেশনে কলকাতার গাংচিল থেকে প্রকাশিত বইটা আমাদের দেশে পাওয়া যাবে অঙ্কুর প্রকাশনীতে।

ডাক্তারের হাতের লেখা নিয়া হাইকোর্ট দেখা



১.
এককালে আমাদের যাদের হাতের লেখা খারাপ তাদের বাপ-মারা এই ভেবে সান্ত্বনা পাইতো যে ছেলে অন্তত ডাক্তার হতে পারবে। আক্ষরিক অর্থেই আমার অনেক সহপাঠী, সহকর্মী হাতের লেখা খুবই বাজে-ওরা আমাকে বলেছে ওদের ওই দুর্বোধ্য হাতের লেখাই এ পর্যন্ত আসতে ওদের উৎসাহ দিয়েছে। মেডিকেলে রিটেন পরীক্ষার তেমন মূল্য নাই। কারন আমরা যদি কোন প্রশ্নের উত্তর না পারতাম- সেটা হায়ারোগ্লিফিক লিপিতে লিখে দিয়ে আসতাম, স্যাররা মার্ক দিতে বাধ্য- ছেলে ডাক্তার হবে, হাতের লেখা বোঝা যাবে না এটাই সত্য, কি লিখছে সেটা সত্য না। এ কারনেই মেডিকেলের বড় বড় পরীক্ষাগুলো হয় গোল্লাপূরণ করে। গোল্লাপূরণ কখনো দুর্বোধ্য ভাবে করা যায় না।
২.
ডাক্তারদের হাতের লেখা খারাপ এটা শুধু আমাদের দেশের জন্য সত্য না। দুনিয়ার সব দেশে তাদের লেখা নিয়ে এই কথা প্রচলিত। তবে হাইকোর্ট যখন রায় দিল হাতের লেখা বোধগম্য করতে হবে তখন কিছু প্রশ্ন সামনে আসে। হাতের লেখা বোধগম্য বলতে আসলে কি বোঝায়- আমি যে কারো হাতের লেখা নিয়েই বলতে পারি- এই লেখা বোধগম্য না। কারন লেখা খুব স্বতন্ত্র জিনিস, একজনের সাথে অন্য জনের হাতের লেখা খুব কম মেলে। তাই এই বোধগম্যতার স্টান্ডার্ড আসলে কিভাবে যাচাই করা হবে?
যেকোন দুর্বোধ্য হাতের লেখার ডাক্তার অন্তত একশ জন ঔষধ বিক্রেতার সাক্ষ্য নিতে পারবে এই মর্মে যে তারা তাঁর লেখা বুঝেছে। তাই এই অভিযোগ আসলে কিভাবে করা হবে আমার কাছে পরিস্কার না।
৩.
এই আইনটা সত্যিই যদি কার্যকর করা হয়- সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে কিন্তু ডাক্তাররাই। কি রকম- সরকারি হাসপাতালের আউটডোরের চর্ম ও যৌন বিভাগের সামনে একদিন চলে যান। দেখবেন লাইনে দাড়ায় আছে মিনিমাম দুইশো রোগী ( স্বাভাবিক, এদেশের মানুষের চুলকানি বেশি)।
এখন সেখানে বসা ডাক্তার সাহেব স্বভাবতই ত্রিশ চল্লিশ সেকেন্ডে রোগ নির্ণয় করে প্রেসক্রিপশন লেখে। তার হাতের লেখা জয়নুল আবেদীনের মত হলেও এক সপ্তাহের ভেতরে সেগুলো বিগড়ে যাবে- হয়ে উঠবে পালি বা হিব্রু ফন্ট- বুঝতে পারবে কেবল ঔষধের দোকানদার। এখন এই ডিউটি ডাক্তার যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সুন্দর হরফে লিখতে যায়- সবদিক থেকেই তার লাভ। বিশ পঁচিশটা রোগী দেখলেই হবে- মাথা থাকবে পরিস্কার- রাতে ঘুমও ভাল হবে।
৪.
অল্প স্বল্প অভিযোগে আমরা সরব থাকি, অধিক অভিযোগে নির্বাক।
কথাটার উপযুক্ত প্রয়োগ টের পেয়েছি যখন ইন্টার্নি কর্তাম তখন দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়া কত কিছু লিখতাম, এখন উপজেলা পর্যায়ে ডিউটি করে আমি পাথর হয়ে গেছি। মনে হয় ধুর বা... , কি হবে এইসব দশজনকে বলে।
আমাদের হাইকোর্ট 'সুন্দর হস্তলিপি' নিয়া চিন্তিত, কিন্তু পৃথিবীর আর কোন দেশে যে কেউ চাইলেই যে কোন ঔষধ ফার্মেসী থেকে কিনতে পারে কিনা সেটা আমার জানা নাই- ভীষণ সব দুর্নীতিগ্রস্থ দেশেও এটা স্বপ্নাতীত ব্যাপার, আর আমাদের শুধু গ্রামে গঞ্জে না, রাজধানী শহরও যেন সোনার খনি- চাইলেই যেকোন ঔষধ কেনা যায়। উন্নত দেশের অনেকে নিশ্চয়ই এটা জানলে আমাদের হিংসা করতো। হাইকোর্ট বা কেউই এই ঔষধের মহোৎসব নিয়া ভাবিত না।
৫.
আর ভাবছেন প্রেসক্রিপশন ছাড়া ঔষধ কেনা বন্ধ করবেন? এই প্রেসক্রিপশন যোগাড় করাও কোন ব্যাপার না। এদেশে বৈধ ভাবেই যে কেউ নামের আগে ডাক্তার লাগাতে পারে, রিপিট করছি বৈধ ভাবে। হাসপাতালে ডাক্তারদের সহকারী হিসেবে যাদের কাজ করার কথা, হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট বা স্যাকমো যারা- তারা কিন্তু একটা মামলা দিয়ে রাখছে তারা কেন নামের আগে ডাক্তার লাগাতে পারবে না- সেটার কিন্তু রায় হয় নাই। হাইকোর্ট এখানে নিরব। আর নীরবতা সম্মতি- আইনতই। তাই তারা নিজেদের নামের আগে ডাক্তার লিখছে- এইটা পুরোপুরি বৈধ। তারা যেকোন ঔষধ প্রেসক্রাইব করতে পারবে- আমি আপনি টু শব্দটি করতে পারবো না। গ্রামে গঞ্জে তারাই রোজ হাজার হাজার প্রেসক্রিপশন লিখছে, মজার ব্যাপার হচ্ছে আমি যেখানে আছি সেখানে তাদের অনেকের ভিজিট বিসিএস ক্যাডার হয়ে আসা ডাক্তারদের চেয়ে বেশি বা সমান!!
অথচ দুনিয়ার সব দেশেই প্রেসক্রিপশন লেখার জন্য লাইসেন্স লাগে, উন্নত দেশে ডাক্তারি পড়া শেষ করেও সেই লাইসেন্সের জন্য আলাদা পরীক্ষা দেয়া লাগে। আমি আমার দেশের যত বড় ডিগ্রী নিয়াই ইয়োরোপ আম্রিকায় যাই না কেন- ওদের দেশের নিজস্ব পরীক্ষা দিয়ে তারপর প্রেসক্রিপশন লেখার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। আর আমাদের দেশ ওপেন ফিল্ড, ভারত থেকে যদু-মধু ডাক্তাররা এসে অ্যাপোলোর চেম্বারে বসে রোগী দেখে যায়- কেউ টেরই পায় না।
৬.
এদেশ আসলে স্বর্গরাজ্য, হলিউডি মুভি টিভি সিরিয়ালে দেখি- ডাক্তার হয়েও কোন কোন ঔষধের জন্য ওরা কেমন কান্নাকাটি করে- সহকর্মীর হাতে পায়ে ধরে কয়- আমারে ওই ঔষধটা লেইখা দেও না, আমি ব্যথা সহ্য করতে পারতেছি না। সহকর্মী ডাক্তার কয়, তুমি আমার লাইসেন্স বাতিলের ধান্দা করতেছো। আর আপনি আমি দেখেন কি সুখে আছি- দুনিয়ার যেকোন অ্যান্টিবায়োটিক, যেকোন ব্যাথার ঔষধ, ঘুমের ঔষধ আমরা চাইলেই কিনে খাইতে পারি, পাড়া প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনকে খাওয়াতে পারি। এই একান্ত সুখে আমাদের মাঝে হাইকোর্ট কখনো বাঁধা হয়ে দাড়ায় নাই।
তাই বিভেদ ভুলে হাইকোর্টের পাশে থাকুন। সুখে থাকুন।