কোহিনূর এর আসল মালিক কে? চলুন দেখি এর রোমাঞ্চকর ইতিহাস কি বলে!


বিখ্যাত হীরা কোহিনূরের মালিকানা নিয়ে আবারও সরব হয়ে উঠেছে সংবাদমাধ্যম। ভারত এখন বলছে, এটা নাকি ইংরেজদের উপহার হিসেবেই দিয়েছিল তারা। সত্যিই কি তাই?
বছরের পর বছর কোহিনূরকে নিজেদের সম্পদ বলে ব্রিটিশদের চুরি আর লুটতরাজের অভিযোগে জর্জরিত করে এসেছে ভারত। ব্রিটিশদের কোনো হোমড়াচোমড়া ব্যক্তি ভারত সফরে এলেই ‘আমাদের হিরেটা কিন্তু এখনো আপনাদের পকেটে দাদা’ বলে হরহামেশাই বিব্রত করেছে। কিন্তু ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কিনা হাত কচলে বলে ফেলল—হিরেটা আমরা স্বেচ্ছায় ব্রিটিশদের উপহার দিয়েছিলাম, ওর প্রতি আমাদের আর দাবি নেই!’ তখন চোখ কপালে তোলাই দস্তুর। আসলেই কি কোহিনূর স্রেফ উপহার হিসেবে ভারত থেকে বিলেতে গিয়েছিল? নাকি দাবি করে পাওয়া যাবে না বুঝতে পেরে ভারত সরকার কপট পুণ্যার্থীর মতো দানের মহত্ত্বে কোহিনূরের মালিক হতে চাইছে। সেটা হয়ে থাকলে এ এক মোক্ষম চালাকিই বটে। কেননা কোহিনূরের দাবিদার তো ভারত একাই নয়। শেষবারে উপমহাদেশের যে অংশে কোহিনূর তার জ্যোতি ছড়াচ্ছিল, সেটা ছিল শিখ সাম্রাজ্য লাহোর। তাই পাকিস্তানের দাবির জোরও কিন্তু বেশি বই কম নয়। আবার কোহিনূরের নাম রাখিয়ে সম্রাট নাদির শাহর দেশ ইরানও মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে, রত্নটা তাদের ঘরেই শোভা পাওয়াটা নৈতিক আর শোভন। তাই এ ইতস্তত দাবিমুখর দেশগুলোকে একহাত দেখিয়ে দিতে ভারত যদি দানের মন্ত্রে কোহিনূরের মালিক হয়ে ব্রিটিশদের সঙ্গে দহরম-মহরম সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, তবে তা তাদের এক দুর্দান্ত চালই বলা চলে।

কিন্তু ইতিহাস সচেতনরা এই বালখিল্য বদান্যতায় ভ্রু কুঁচকাতেই পারেন। কেন, সেটাই ব্যাখ্যা করি। কোহিনূর কিন্তু বাকি প্রসিদ্ধ রত্নগুলোর মতো দেখতে-শুনতে ভালো বলেই সবার নজরকাড়া নয়। বরং রত্ন হিসেবে এর গুরুত্ব সামান্যই। কোহিনূর আসলে একটি কিংবদন্তি, এক অসম্ভব ইতিহাসের টুকরো। রক্তাক্ত আর অভিশপ্ত অধ্যায় জুড়ে আছে এর পরতে পরতে। পৃথিবীতে অন্য কোনো রত্ন নিয়ে এত বেশি কল্পকাহিনী রচিত হয়নি, এত ঠিকুজি হিসাব করা হয়নি, এমনকি এত কিংবদন্তিও তৈরি হয়নি। কেউ বিশ্বাস করে এটি ঈশ্বরের অশ্রু, যা পৃথিবীতে এসে পড়েছে। বেশ যথার্থ কল্পনাই বটে। আর মহামূল্য এই রত্নে যে-ই হাত দেবে, তার জীবনই নাকি দুঃখে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। হাজার বছরের ইতিহাসও তা-ই সাক্ষ্য দেয়। কোহিনূরের উৎস নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো, তেরো শতকে অন্ধ্রপ্রদেশের কল্লুর খনি থেকে উত্তোলিত হয়েছিল এটি। সে হিসেবে এর প্রথম মালিক ছিল দক্ষিণ ভারতের কাকাতিয়া সাম্রাজ্য। কিন্তু এটা আবার মানতে রাজি নয় কিংবদন্তিপ্রিয় অনেকেই। তাদের বক্তব্য, এ হিরের আঁতুড়ঘর যাচাইটা এত সহজ নয়।

স্মরণাতীতকাল থেকেই এ রত্ন ভারত উপমহাদেশে ছিল, মহাভারতের বীর কর্ণ আর অর্জুনের আয়ত্তে থাকা সামন্তিক মণিই আসলে কোহিনূর। সেটা মেনে নিলে খ্রিস্টের জন্মেরও তিন হাজার বছর আগে গিয়ে হিসাব করতে হয় এর বয়স। পুরাণপ্রিয় কেউ বলেন, হিরেটা প্রথমে পেয়েছিল এক রাখাল বালক। যার জোরে সে ভারতের এক রাজার প্রিয় পাত্র ও পোষ্যপুত্রের মর্যাদা পায়। সে রাখাল বালক পরে রাজা হয়; কিন্তু এ রত্নের অভিশাপে নিহত হয়। এ রত্নও বেদখল হয়ে এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘুরতে থাকে। এই কিংবদন্তির সঙ্গে কিন্তু আশ্চর্য মিল আছে কোহিনূরের বর্ণাঢ্য মালিক নাদির শাহর জীবনের। নাদির শাহও রাখাল বালক ছিলেন এবং একসময় ইরানের সম্রাট হয়ে কোহিনূরেরও মালিক হন।

কিংবদন্তি যা-ই থাকুক, কোহিনূরের বিশ্বস্ত ইতিহাসে যে ব্যক্তি সব সময় ভাস্বর তিনি মোগল সম্রাট বাবর। কেননা বর্তমান নামকরণের আগে কোহিনূরের পরিচয় ছিল বাবরের হীরা নামে। এ এক আশ্চর্য ঐতিহাসিক ব্যাপার। কেননা বাবর কখনোই কোহিনূরের মালিক ছিলেন না, কখনো তাঁর পাগড়ি বা হাতের বাজুবন্ধনেও ব্যবহার করেননি। তিনি কেবল কোনো একদিন হিরেটা হয়তো স্পর্শ করেছিলেন মাত্র। কিন্তু তাঁর নামেই বহু বছর রত্নসন্ধানীরা মনে রাখে কোহিনূরকে। যখনই নতুন করে কেউ এর মালিক হয়েছে তখনই নিশ্চিত হতে চেয়েছে, এটা কি সেই হিরে, যা মহামতি বাবর উল্লেখ করে গেছেন? লিপিবদ্ধতা সে যুগের মানুষকেও কতটা প্রভাবিত করত, তারও এ এক প্রমাণ। কারণ সম্রাট বাবর তাঁর বাবুরনামায় প্রথম কোহিনূরের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
অন্ধ্রপ্রদেশের কল্লুর খনিই কোহিনূরের উত্পত্তিস্থল ধরে নিলে মোগলদের আয়ত্তে এ হিরে আসে তারও প্রায় তিন শ-সাড়ে তিন শ বছর পর। চৌদ্দ শতকে আলাউদ্দিন খলজি যখন মালওয়া ও দাক্ষিণাত্য অভিযান করেন, সে সময় হিন্দু শাসক রায় মাহলাক দেও থেকে এ অতুলনীয় রত্ন মুক্তিপণ হিসেবে পান। তখনই তাঁরা জানতেন, এ হিরের মতো তুলনীয় দ্বিতীয় কোনো রত্ন ধরাধামে নেই। খলজি সেটি পরে টোমার রাজবংশকে দান করে যান কোনো এক সাহায্যের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ। তারপর সেটি এই বংশের সম্পদভাণ্ডারে রয়ে যায় বহুকাল। মোগলরা যখন পানিপথের যুদ্ধের পর আগ্রার দুর্গ ঘিরে ফেলে, তখন গোয়ালিয়রের মহারাজার স্ত্রী, সন্তানরা ও ভৃত্যরা পালাতে গিয়ে ধরা পড়েন। তাঁদের ভাগ্যে কী হবে সে সিদ্ধান্তের জন্য শাহজাদা হুমায়ুনের মত চাওয়া হয়। উদার শাহজাদা তেমন কোনো চিন্তাভাবনা না করেই তাঁদের মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন। বাবর তাঁর আত্মস্মৃতিতে পুত্রের এ ঘটনা নিয়ে লিখেছেন, বন্দীরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে তরুণ শাহজাদাকে অনেক রত্ন উপহার দিয়ে যায়। যার মধ্যে ছিল আলাউদ্দিন খলজির সেই বিখ্যাত হীরাও। এভাবে হীরাটা মোগল সাম্রাজ্যে প্রবেশ করলেও সেটি শিগগিরই চলে যায় পারসিয়ানদের হাতে। সম্রাট হুমায়ুন তাঁর চরম দুরবস্থার সময়ও কোহিনূর হাতছাড়া করেননি। কিন্তু পরে পারস্যের সম্রাট শাহ তাহমাস উপহার দেন হীরাটা—তাঁকে আশ্রয় দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা হিসেবে। সম্রাট তাহমাস হীরাটা কোনো কারণে নিজের কাছে আর রাখেননি, আরেকজনকে দান করে দেন। তিনি সম্ভবত ভয় পাচ্ছিলেন, কোহিনূরের অভিশাপ তাঁর গায়েও লাগে কি না! এটা বেশ প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল যে এই রত্ন কোনো পুরুষ ভোগ করলে তাকে দুর্ভাগ্য বরণ করতে হবে। শুধু নারী ও ঈশ্বর এটা পরিধান করতে পারবেন। কথিত আছে, এ কথা লেখা এক শিলালিপিও পাওয়া গিয়েছিল। কাকতালীয় হলেও, কোহিনূরের অধিকাংশ মালিকই অপঘাতে বা যুদ্ধে, নয়তো আত্মীয়স্বজনের ষড়যন্ত্রে মারা গেছেন। সম্রাট হুমায়ুন সিঁড়ি থেকে নামতে গিয়ে পা পিছলে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা গিয়েছিলেন, সম্রাট শাহজাহান পুত্রের নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েছেন, নাদির শাহ মারা যান নিজের কাছের মানুষের হাতে। এই অভিশাপের কথা এতটাই প্রচলিত যে কোহিনূর নিয়ে যত ইতিহাস বই আছে, সেগুলোতেও এর উল্লেখ আছে। ফরাসি পর্যটক ট্যাভারনিয়ের, যাঁর সৌভাগ্য হয়েছিল ভারতের সব বিখ্যাত হীরা দর্শনের, তিনিও তাঁর বিখ্যাত সিক্স ভয়েজেস বইতে এ কথা বলে গেছেন। এমনকি ব্রিটিশরাও এই কুসংস্কারে বিশ্বাসী। আজ পর্যন্ত কোনো ব্রিটিশ রাজপরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য এই রত্ন ছুঁয়েও দেখেনি।

সম্রাট হুমায়ুন থেকে কোহিনূর হাতছাড়া হওয়ার পর সেটি আবার মোগলদের কাছে আসতে বেশ কয়েকবার হাতবদল হয়। শাহ তাহমাস আহমেদ নগরের রাজা বুরহান নিজাম শাহকে কোহিনূর উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই উপহার উপযুক্ত প্রাপকের হাতে পৌঁছেনি বলেই ইতিহাসবিদরা মনে করেন। ধারণা করা হয়, সেটির বাহক জামাল শাহ মাঝপথে বিজয়নগরে হিরেটা বিক্রি করে দেন। তারপর এই অতুলনীয় রত্নের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, সেটি আবারও প্রহেলিকাময় অধ্যায় হিসেবে থেকে যায়। কোহিনূরকে এরপর আমরা আবিষ্কার করি ১৬৫৬ সালের ৭ জুলাই, জাঁকজমকপূর্ণ একটি দিনে, মোগলদের রাজধানী দিল্লিতে। ওই দিন দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন ইতিহাসের বিখ্যাত রত্ন ব্যবসায়ী মীর জুমলা। অতি সাধারণ এক তেল ব্যবসায়ীর পুত্র জুমলা নানা চতুরতায় বিপুল রত্ন ও সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। সেদিন তিনি মোগল সম্রাট শাহজাহানের জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে আসেন কোহিনূর। পরবর্তীকালে সম্রাট শাহজাহানের খুব পছন্দের বস্তুতে পরিণত হয় কোহিনূর। সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এটি মোগলদের কাছে ছিল। পারস্য সম্রাট নাদির শাহ মোগলদের থেকে কোহিনূর ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। ১৭৩৯ সালে নাদির শাহ দিল্লিতে মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। এর কিছুদিন আগেই কর্ণালের যুদ্ধে মোগলরা নাদির শাহর বাহিনীর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। তাই এ সাক্ষাৎ আসলে ছিল একজন জয়ী সম্রাটের পরাজিত শত্রুশিবিরে আনন্দ ভ্রমণের মতোই। দিল্লিতে তিনি বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে আসেন। নাদির শাহ ছিলেন অত্যন্ত চতুর ও ধূর্ত। তা না হলে অবশ্য তিনি সম্রাট হতে পারতেন না। কেননা তিনি কোনো রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন না। অপর দিকে সে সময়কার মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহ ছিলেন অযোগ্য ও লম্পট। কথিত আছে, হারেমের রমণীদের সান্নিধ্য বা হাতে পানপাত্র ছাড়া তাঁকে কখনো দেখা যেত না। নাদির শাহ তাঁকে বুদ্ধির প্যাঁচে ফেলে কোহিনূর নিজের জিম্মায় নিয়ে নেবেন—সেটাই স্বাভাবিক। নাদির শাহ জানতে পারেন, মোগল বাদশাহ তাঁর পাগড়িতে কোহিনূর লুকিয়ে রাখেন। তখন তিনি এক কৌশলের সাহায্য নেন। তিনি মোহাম্মদ শাহকে একটা প্রাচীন রীতির কথা মনে করিয়ে দেন—যেটা ছিল দুই বাদশাহ পরস্পর দেখা হলে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে পাগড়ি বিনিময় করবেন। মোগল সম্রাটের বুঝতে বাকি ছিল না—এ প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার অর্থ বন্ধুত্বের আহ্বান ফিরিয়ে দেওয়া। আর তখনকার পরিস্থিতিতে এটা করার সুযোগ তাঁর ছিল না। তাই তিনি পাগড়ি বিনিময় করতে বাধ্য হলেন। এভাবেই নাদির শাহ হীরাটির মালিক হয়ে যান। নিজ কক্ষে এসে এর দ্যুতিতে চমকে উঠে নাম দেন কোহিনূর বা আলোর পাহাড়।
কোহিনূর তার রক্তাক্ত ইতিহাস প্রলম্বিত করে এর পরে আরো কয়েকবার হাতবদল হয়। পারস্য থেকে সেটি চলে যায় আফগানিস্তানের শাসকদের কাছে। তার পরই শেষ ভারতীয় শিখ সম্রাট রণজিৎ সিং মালিক হন এর। কোহিনূরের অভিশপ্ত আঁচড় একমাত্র রণজিৎ সিংই এড়িয়ে যেতে পারেন। কোহিনূরের মালিকদের মধ্যে অন্যতম বর্ণাঢ্য জীবন ছিল তাঁর। তিনি কোহিনূরের সর্বোচ্চ ভোগকারী বা ব্যবহারকারীও ছিলেন। নিজ হাতে পরতেন। স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধ হয়ে মারা যান। অসাধারণ সাফল্যে রাজ্য পরিচালনা করেন। ধারণা করা হয়, মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি কোহিনূর জগন্নাথ মন্দিরে দান করে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু তাঁর সে ইচ্ছা পূরণ করা হয়নি।
রণজিৎ সিংয়ের মৃত্যুর পর সুশৃঙ্খল শিখ সাম্রাজ্যে ফাটল ধরে, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে পড়ে। সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র ও গুপ্তহত্যা শুরু হয়। ইংরেজরা এটাকে সুযোগ হিসেবে নেয়। কেননা তখন পুরো উপমহাদেশে একমাত্র শিখদের পাঞ্জাবই ছিল ব্রিটিশদের আওতামুক্ত । শুরু হয় অ্যাংলো শিখ যুদ্ধ, যেখানে ইংরেজরা বিজয়ী হয়। ইংরেজরা পরবর্তী সময়ে রণজিৎ সিংয়ের এগারো বছরের পুত্র দালিপ সিংকে পুতুল সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে বসায় এবং শেষ লাহোর চুক্তি সম্পন্ন করে। এই চুক্তির ধারা অনুযায়ী রাজ্যের সব সম্পত্তির মালিক হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি। সেখানে এটাও উল্লেখ করা হয়, মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের কোহিনূরের মালিক হবেন ইংল্যান্ডের রানি। মূলত এ চুক্তির মাধ্যমেই কোহিনূর ১৮৪৯ সালে এক ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজে করে তার উত্পত্তিস্থল ভারতবর্ষ ত্যাগ করে। দেড় শ বছরের বেশি পেরিয়ে গেলেও এ ভূ-খণ্ডে আর ফিরে আসেনি। রানি ভিক্টোরিয়ার একটি অপূর্ব সুন্দর টিয়ারায় মূল রত্ন হিসেবে স্থান হয় কোহিনূরের। পরে ১৯১১ সালে রানি মেরির মুকুটে স্থাপিত হয় হিরেটা। স্বামী পঞ্চম জর্জের অভিষেক অনুষ্ঠানে তিনি এ মুকুট পরেন। শেষতক ১৯৩৭ সালে রানিমাতা এলিজাবেথের মুকুটে স্থান পায় বিখ্যাত এ হীরক খণ্ড। ২০০২ সালে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় তাঁর কফিনের ওপর রাখা ছিল মুকুটসহ এ বিখ্যাত রত্ন। বিশ্ববাসীর সামনে শেষবারের মতো টিভির পর্দায় সরাসরি সেদিনই প্রদর্শিত হয় কোহিনূর। বর্তমানে লন্ডন টাওয়ারের জুয়েল হাউসে রক্ষিত আছে রত্নটি। নতুন কোনো জোরালো দাবি না তোলা হলে এই সুরক্ষিত অবস্থান হয়তো পরিবর্তন হচ্ছে না শিগিগরই। পৃথিবীর ইতিহাসে কোহিনূর আসলেই একটি অবিশ্বাস্য রত্ন। কেননা ভারতীয় উপমহাদেশের এমন আর কোনো বস্তু নেই, যা নিয়ে আলোচনা করলে ঘুরে আসা হয় ভারতের সুপ্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত পুরো ইতিহাস। এটি ছাড়া অন্য কোনো স্মারক নেই, যা দিয়ে হাজার বছরব্যাপী বিস্তৃত পারসিয়ান, তুর্কি, মোগল, আফগান ও পাঞ্জাবি সাম্রাজ্য এবং ব্রিটিশদেরও একসূত্রে গাঁথা যায় বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক তথ্য দিয়েই। আর পুরাণ, লোককথা হিসাব করলে ঈশ্বর আর দেবতারাও এর সঙ্গে যুক্ত। না, এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হীরা নয়, এমনকি সবচেয়ে সুন্দরও না। কুলিনান কোহিনূরের চেয়ে অনেক বড়, ক্রেমলিনের ওরলভ ডায়মন্ড বা ল্যুভরের রিজেন্ট ডায়মন্ড কোহিনূরের চেয়েও অনেক সুন্দর। তার পরও পৃথিবীর কোনো রত্নই ঐতিহাসিক ও রোমান্টিক মূল্যে কোহিনূরের ধারে-কাছেও নেই।

(লেখক : কোহিনূর নিয়ে রচিত উপন্যাস ‘মিনিমালিস্ট’-এর রচয়িতা)

প্রথম প্রকাশ : দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২৪ এপ্রিল ২০১৬

Comments

Post a Comment