আমাদের মস্তিষ্কই হয়তো আমাদের প্রতিভা বিকশিত হতে দিচ্ছে না!!

কোন একদিন সকাল সাড়ে ৬ টায় ওঠা আমার ভীষণ জরুরী ছিল, বেশ রাত করে ঘুমাই বলে স্বভাবতই বেশ কষ্টকর এটা আমার জন্য । ফোনের অ্যালার্ম ঘড়িতে সাড়ে ছয়টা থেকে পরপর কয়েকটা অ্যালার্ম সেট করে ঘুমাতে গেলাম।
পরদিন আমার ঘুম ভাঙলো ঠিক ৬ টা ২৯ এ, কাটায় কাটায়। অ্যালার্ম ঘড়ি দরকারই পড়লো না।
এই ব্যাপারটা অনেকবারই ঘটেছে। যখন ভেবে রাখি এই সময়ে উঠতেই হবে সেদিন ঠিক ঘড়ির কাটায় কাটায় ঘুম ভাঙে। ঠিক কাটায় কাটায় প্রয়োজনীয় সময়ে জেগে উঠার এ ব্যাপারটা শুনেছি অনেকেরই হয় মাঝে মধ্যে।
এটা কিভাবে সম্ভব সেটা অবাক হয়ে ভাবার চেষ্টা করেছি।
আমাদের দেহে এমনিতেই সারকাডিয়ান ক্লক বলতে ঠিক ২৪ ঘন্টার একটা ব্যবস্থা আছে যেটার কারনে দেহের বিভিন্ন তন্ত্র সময় অনুযায়ী তাদের জৈবিক পরিবর্তন ঘটায়, কিন্তু এই ক্লক একদম মিনিট ধরে কাজ করে না।
তাহলে এটা কোন ঘড়ি যেটা একদম হিসাব করে ঘুম ভাঙাল?
হয়তো আমাদের মস্তিষ্কে এরচেয়েও অনেক নিঁখুত একটা ঘড়ি আছে, যা সেকেন্ড ধরেও হিসেব করতে পারে। এর একটা উদাহরণ হচ্ছে- কিছু মানুষ নাকি ঘড়িতে কয়টা বাজে তা আন্দাজ করে হুবহু মিনিট সহ বলতে পারে।

মস্তিষ্ক একটা রহস্যেভরা বাক্স এখনো। মাঝে মাঝে সে বাক্সের কিছু কিছু ব্যাপার বেড়িয়ে আসে, আর আমরা আমাদের কিছু প্রশ্নের জবাব পাই-প্রশ্নগুলো হয়তো হাজার বছরের পুরনো।
অনেক কিছুই আমরা বুঝি না, মস্তিষ্ক ঠিকই বুঝে রাখে। কোন বিষয় কত চেষ্টা করি মনে রাখতে, সে পাত্তাই দেয় না, কয়েকদিন বাদেই মুছে ফেলে, আবার এমন অনেক বিষয় মনে রাখে যেটা হয়তো মনে রাখতেই চাই নি।
আমাদের নিজেদেরই নিয়ন্ত্রনই নেই নিজেদের মস্তিষ্কের উপর। মস্তিষ্ক কতটা শক্তিশালী সেটাও কেউ জানে না। মস্তিষ্কের আচরণ দেখলে মনে হয়, সে তার ক্ষমতা আমাদের থেকে লুকিয়ে রাখতে চায়। কারন যেসব মানুষ অসম্পূর্ণ মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মায় তারা কখনো আশ্চর্য ক্ষমতা নিয়ে জন্মে, যেন ঠিকভাবে গঠিত হতে পারেনি বলে সে তার ক্ষমতা লুকাতে পারেনি। যেমন, কিম পিক নামের একজন লোক ছিলেন, যিনি সেরেবেলাম এর ড্যামেজ নিয়ে জন্মেছিলেন। আমরা সচরাচর মনে রাখতে পারি ৪-৫ বছরের পর থেকে, কিন্তু কিম পিক মনে রাখতে পারতেন ১৬-১৭ মাস বয়স থেকে। তিনি যে বইই পড়তেন তার সাথে সাথেই সেটা মুখস্ত হয়ে যেত। তার ঠোটস্থ ছিল প্রায় ১২,০০০ বই! কোন হিসেব করতে তার ক্যালকুলেটর লাগতো না। (পরে তার জীবন নিয়ে ‘রেইন ম্যান’ নামে একটা মুভি বানানো হয়েছিল)। একই ভাবে অটিস্টিক শিশুরা, যাদের মস্তিষ্ক বিকশিত না, তারাও নানা ক্ষমতার অধিকারী। মস্তিষ্কের আরেকটা রোগ আছে যাকে বলে স্যাভান্ট সিন্ড্রোম। এই সিন্ড্রমের মানুষ রাতারাতি গণিতে তুখোড় হয়ে যায়, গাইতে পারদর্শী হয়,হয়ে উঠে মিউজিক কম্পোজার, দারুণ আঁকতে পারে।তারমানে আমাদের অসাধারণ কিছু দক্ষতাও মস্তিষ্ক ঢেকে রাখে!
তবে এ বছর নোবেল প্রাইজ ঘোষণা হবার পর জানলাম আমাদের মস্তিষ্কে আরো একটা মারাত্মক পজিসনিং সিস্টেম আছে- যা আমাদের স্মরণ করায় আমরা ঠিক কোথায় আছি।মস্তিষ্কের এই জিপিএস সিস্টেম ব্যাখ্যা করার জন্য তিনজন বিজ্ঞানী চিকিৎসা শাস্ত্রে নোবেল প্রাইজ পেলেন। পুরো ব্যাপারটা জেনে আমি খুব অবাক হলাম- আমাদের মাথায় নাকি 'প্লেস সেল' নামক কিছু কোষ থাকে যা জায়গা চেঞ্জ হলে ধরতে পারে, মার্কিন গবেষক অধ্যাপক ও’কিফি এটা অবশ্য অনেক আগেই আবিষ্কার করেছেন। বাকী দুজন, মে-ব্রিট ও এডভার্ড বিজ্ঞানী দম্পতি জানালেন আমাদের মস্তিষ্ক আসলে গ্রিডের মত কাজ করে, এখানে গ্রিড সেল নামক কিছু সেলও আছে যারা ল্যাটিচুড, লংগিচুড এর পার্থক্যও ধরতে পারে।

মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণার আসলে এখনো অনেক বাকী-কারন মানুষের এ অংশটিই এখনো ব্যাখ্যাতীত, সুপ্রাচীন কাল থেকেই দার্শনিকরা বলেছেন-নো দাইসেলফ, নিজেকে জানো!
নিজেকে জানাই সবচেয়ে বড় জ্ঞান, সেটা অন্তত সময়ের সাথে সাথে আরও সত্যি হয়েছে।

Comments