মমতাময়ী

ফারিয়ার চোখের দিকে তাকালে আমি ইদানিং কেমন যেন অস্বস্তিতে ভুগি, কোথাও একটা অপরাধবোধ কাজ করে। ওর শিশুর মত সরল চাহনি, যেটা নি:সন্দেহে আবেগে ভরা সেটার মধ্যে এমন একটা ব্যাপার আছে যা আমি এড়াতে পারি না।
তুমি এমন হয়ে গেছ ক্যান? ফারিয়া অভিমানি সুরে বলল।
ক্যামন? আমি নির্লিপ্ত ভাবে জবাব দেই।
আমি জানি ও কি জন্য বলছে। আমি বদলে গেছি সেটা ও বুঝতে পারবে সেটাই স্বাভাবিক, মেয়েটা কিছুটা বোকাসোকা, তবে অতটা নয় যে কিছুই বুঝবে না।
আচ্ছা, ও আমাকে কতটা বুঝতে পারে এখন? আমি ভাবলাম। সময়টা তো কম নয়, তিন দিনেই একজন মানুষকে মোটামুটি বুঝে ফেলা যায়, তার নাড়ি-নক্ষত্র জানতে বড়জোড় তিনমাস লাগে, বোকাসোকা ভাল মানুষ মেয়েটার সাথে প্রায় তিনবছরের মত রিলেশন চলছে আমার। এতদিনে আমি হয়তো অনেকটা বদলে গেছি, তবে ফারিয়া একটুও বদলায় নাই। সেই আগের মত আদুরে গলায় কথা বলে, আবেগ-টাবেগও মনে হয় আগের মতই আছে।
বহুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে ফারিয়া, আমার কথার পিঠেও কথা বলে না, অভিমানী কিশোরীর মত গাল ভার করে বসে থাকে,আমার বাম হাতটা জড়িয়ে ধরে।
ইয়ে, ফারিয়া চল এবার ফিরি। আমার সন্ধ্যার দিকে একটা কাজ আছে।
থাকুক কাজ! যাবে না! আমার সাথে বসে থাকবে! ফারিয়া ঝাঁঝের সাথে বলে উঠে, বাম হাতটা আরো জোড়ে আঁকড়ে ধরে।
ওর এসব ছেলেমানুষী আচরণ একসময় কী মধুরই না লাগতো! এখন কেমন যেন অসহায় বোধ করি।
পার্কে মানুষজন বেশ কম, উদ্বাস্তু টাইপের এক দুইজন চোখে পড়ে। এ যুগে পার্কে রোমান্টিকতা করতে কেউ যায় না, তাতে নানা হ্যাপা, নানা ঝামেলায় পড়ার চান্স আছে। দুএক বছর আগে ব্যাপারটা ভিন্ন ছিল, ফারিয়ার সাথে কতবার এসেছি, বাদামওয়ালা ছোকড়া, চা-অলা সবার মুখ চেনা ছিল।
ফারিয়া, বুঝতে চেষ্টা কর, এখন আমাদের ফেরা উচিত, জায়গাটা নিরাপদ না। চল কোন রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসি না হয়।
আমার কথা গায়ে মাখে না ও। কলকল করে হঠাৎ বলে উঠে, ওই যে দেখো সামনের কদম ফুল গাছটা, সেদিন কেমন গোল গোল ফুলে ছেয়ে ছিল গাছটা মনে আছে তোমার?
কোনদিন? আমি সর্তক চোখে ওর দিকে তাকাই।
একদম প্রথম দিন, তোমার সেটা মনে থাকবে কেন?
আমি হেসে উঠি, আমি তো সেদিন তো শুধু তোমার দিকেই চেয়ে ছিলাম, চারপাশে দেখার ফুরসত ছিল নাকি?
কথাটা বলেই মনে হল, বিরাট ভুল হয়ে গেছে। রোমান্টিক কথা এখন যত বাড়বে ততই আমার জন্য ঝামেলা।

আজকে কিছু কঠিন কথা বলা প্রয়োজন, বহুভাবে বোকা মেয়েটাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, দূরত্বটা বাড়াতে চেয়েছি ধীরে ধীরে, কারন আমি চাই না কোন অঘটন ঘটাক ও আর আমি ঝামেলায় পড়ি। ফোনে আগের মত কথা বলি না ব্যস্ততার অজুহাতে। ফেসবুকে ও আমার ওয়ালে পোষ্ট করে, মেসেজ দেয়, সেগুলোর রিপ্লাই দেই না, দায়সারা ভাবে দুএকটার দেই। কিন্তু অর্পির সাথে ঠিকই ওয়াল-টু-ওয়াল কথার পিঠে কথা চলতেই থাকে। এগুলা কি ও দেখে না? তারপরও না বুঝলে আমার কি দোষ!
মানছি আমার ভুল আছে, এতদিনের রিলেশনটা হালকা কিছু না, দাম্পত্যের সাথে খুব বেশি পার্থক্য নেই। কিন্তু মানুষের মন ভারী বিচিত্র- এটা তো মানতেই হবে। অর্পির সাথে পরিচয় হবার পর এখন আর ওকে একদমই ভাল লাগে না-এটাতে আমার কি করার আছে। নিজের মনের উপর কতটাই বা নিয়ন্ত্রন থাকে মানুষের!তাছাড়া এখনও তো ওর পথ খোলা আছে,সেটা ওর বোঝা উচিত।

অর্পির কথা মনে হলেই ফারিয়াকে কেমন ঝামেলা ঝামেলা মনে হয়।
সি ইজ ড্যাম হট!
আর ফারিয়া একবারে পানসে, বৈচিত্র্যহীন, টিপিক্যাল বাঙালি মেয়ে, সুনীল কি সমরেশ পড়ে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদে, খেলা দেখে না, ওয়েস্টার্ন টিভি সিরিয়াল,মিউজিক কোন কিছুর খোঁজখবর রাখে না, পড়াশোনা ছাড়া কিচ্ছু ভাল লাগে না। এ মেয়েকে ভাল লাগবেই বা কেন? মজার ব্যাপার হচ্ছে ঠিক এসব বৈশিষ্টের জন্যই একসময় খুব ভাল লাগতো ওকে। ছক পুরো উল্টে যায় অর্পির সাথে ঘনিষ্ঠ হবার পরপর।
অর্পির সাথে পরিচয় গত বছর। বেশ জুনিয়র ব্যাচ কিন্তু আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই। তাই খাতির জমাতে সমস্যা হল না, কয়েকমাস নিয়মিত চ্যাট, পড়াশোনার খোঁজখবর, কোন মুভি, কোন অ্যালবাম এসব করেই কথা তো আর ফুরায় না,ব্যস। আমি আবার এ ব্যাপারে বেশ সিদ্ধহস্ত, আগেও কয়েকজনের সাথে এভাবে খাতির করেছি।
ফারিয়া মনে হয় আমার সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের রিলেশন, সেটার কারন বোধহয় মেয়েটার অতিরিক্ত সারল্য,এখন যে ব্যাপারটা মনোটোনাস হয়ে গেছে।

জীবনে জটিলতা প্রয়োজন, ভিতরে বাইরে সমান হলে হবে কিভাবে, ঝলমলে খোলস থাকতে হবে, ভেতরটা যাই থাকুক না কেন!
ব্যাপারটা ভেবে একটু বিস্মিত হলাম, কিছুদিন আগেও এভাবে চিন্তা করতে পারতাম না। মানুষের বাইরের ভানটাকে সহ্য করতে পারতাম না। আর এখন মনে হয় সেটা বেশ প্রয়োজনীয়। নিজের মধ্যেই একটা বহি:আবরণ তৈরি হয়েছে বলেই কি মানসিকতাও পাল্টে গেছে? হতে পারে। সবাই নিজের কাছে ভালো থাকে এভাবেই হয়তো।

পার্কের বেঞ্চিটা কাঠের, নতুন বসানো মনে হয়। কাঠ কাঠ একটা গন্ধ আসছে এখনো। কোথা থেকে হালকা কোন ফুলের গন্ধ আসছে, কী ফুল হতে পারে!
ফারিয়া হালকা সাজগোজ করে এসেছে, শাড়ীটা নীলচে রংয়ের, কানে গলায় পাথরের অর্নামেন্ট-হঠাৎ মনে পড়লো এটাতো আমারই গিফট করা। সবমিলিয়ে কেমন এক সুখী সুখী ভাব ওর চেহারায়।
কিছু কথা বলবো ভাবছিলাম, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আজকে না বলাই ভালো।
ওই জোড় করে আজকে নিয়ে এসেছে পার্কে, ওর নাকি অনেক দিনের শখ একটা দিন সেই আগের মত পার্কে বসে গল্প করবে, গত একমাস থেকে বলতে বলতে আমাকে পাগল বানিয়ে দিয়েছে। নানা অজুহাতে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছি। হঠাৎ মনে হল ওর সাথে ব্যাপারটা নিয়ে একটু খোলাখুলি আলোচনা করা দরকার, পালিয়ে বেড়িয়ে আর কতদিন? তাই আজকে আসতে রাজী হয়ে গেছি।
বেশ অনেকদিন পর দেখা করলাম, ভেবেছিলাম এতদিনে ওর আবেগ-টাবেগ কিছুটা কমে যাবে, মোটামুটি ঝামেলা ছাড়াই সম্পর্কটার ইতি টানতে চাই- সেটা হয়তো বলতে পারবো। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হচ্ছেনা। ওই সারল্য আর ভালবাসায় মাখামাখি চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে সেটা বলা সম্ভব না, তারচেয়ে ফোনেই না হয় বলবো। এখন তাই বেশ আফসোস হচ্ছে কেন আসতে গেলাম।
তোমার ক্লাস কেমন হচ্ছে? কথা চালানোর জন্য জিজ্ঞেস করলাম।
হচ্ছে, ভালই হচ্ছে। সামনে ফাইনাল টার্ম, একটু চাপ আছে।
যে বিদঘুটে সাবজেক্ট তোমার, চাপতো সবসময়ই থাকে।
তা ঠিক, ফারিয়া মৃদু হেসে বলল।
পড়াশোনায় দারুন ভালো মেয়েটা, ফার্মেসীর মত সাবজেক্টে প্রতিটার্মেই প্রথম একদুইয়ে থাকে।
একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম, ইদানিং ফারিয়া বিয়ের প্রসংঙ্গটা তোলে না। এখন আমি ভাল জব করি, নিজের পায়ে পুরোপুরি দাঁড়াতে পারি নি সত্যি কিন্তু বিয়ে করার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি আছে। কিছুদিন ও খুব ঘ্যানঘ্যান করছিলো বিয়ের জন্য, কয়েকমাস ধরে সেটা বন্ধ আছে। ব্যাপারটা বেশ স্বস্তিজনক আমার জন্য।
চল উঠে পড়ি, প্লিজ। আমি এবার অনুনয় করি।

নাহ! বলতে পারলাম না আজও। কয়দিন যে ব্যাপারটা ঝুলে থাকে কে জানে। মজার ব্যাপার হল, আমি ওকে প্রপোজ করবার সময় যতটা নার্ভাস ছিলাম তার উল্টোটা করবার জন্য এখন শতগুন বেশি নার্ভাসনেস কাজ করছে।
অবশ্য এটাতে তাড়াহুড়া করলে সমস্যা আছে, ধীরে সুস্থেই হবে।

চলো উঠি! আমি তাড়া লাগাই।
ও আমার চোখের দিকে গভীর ভাবে তাকাল। আমি তাতে একটু কুঁকড়ে যাই। মনে হচ্ছে চোখের ভিতর দিয়ে ও সব কিছু পড়ে ফেলছে আমার।
জানো, আজকে কেন তোমাকে এখানে আসতে বলেছি। পার্কে কেই বা আজকাল আসে।
কেন?
সেটা হয়তো তোমারও জানা উচিত ছিল, আমি একটু সর্তক হয়ে গেলাম, আবেগতাড়িত কোন দিনটিন থাকলে দ্রুত প্রসংঙ্গ বদলাতে হবে।
আজকে আমাদের তিন বছর পূর্তি। ও মাথা নামিয়ে বলল।
তিনবছর আগে এমন একটা দিনেই তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছিল, তখন কি আর ভেবেছিলাম, ক’দিন পরে তুমিই আমার পৃথিবী হয়ে উঠবে।
হলিশিট! ঝামেলা বাড়ছেই আজকে, ব্যাপারটা একদমই খেয়াল ছিল না আমার। থাকলে ভুলেও আসতাম না, কোনভাবে এড়িয়ে যেতাম।
ও তাই! আমি একটু অপরাধী গলায় বললাম। স্যরি বেবি, জানোই তো কাজ নিয়ে এমন বিজি থাকি, আর এসব পূর্তি টূর্তি বাদ দাও, ওগুলো ইমম্যাচিউরড ব্যাপারস্যাপার।
ঠিক আছে, আমি রাগ করিনি। ফারিয়া আদুরে গলায় বলল। তুমি যে এসেছো আজকে তাতেই আমি খুশি।
যাক, বাঁচা গেল। মনে মনে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেললাম।
ফারিয়া ওর ব্যাগটা খুলে একটা টিফিন বক্স বের করলো, দেখে আমি মনে মনে হাসলাম। সেই পাগলামী এখনো আছে, আগে যখন পার্কে দেখা করতাম তখন রোজ ও কিছু না কিছু রান্না করে নিয়ে আসতো আমার জন্য। রান্নার হাতও বেশ ভাল ওর।

কি নস্টালজিক হয়ে গেলা নাকি?বক্সের ঢাকনা খুলতে খুলতে বললো ও।
তোমার প্রিয় আইটেম, চিকেন-চাউমিন, দেখোতো আগের মত হয়েছে কিনা, আমি রান্নাঘরে যাইনা বহুদিন।
তোমার ছেলেমানুষী গেল না, আমি খাওয়া শুরু করে বললাম। আমি মনে মনে অস্থির হয়ে উঠছি, এইটা শেষ না করা পর্যন্ত বসে থাকতে হবে। তাড়াতাড়ি চামচ চালালাম ।
খেতে অবশ্য অসাধারণ হয়েছে।
বললাম, খুবই দু:খজনক, তুমি ফার্মেসী পড়ছো, বিস্বাদ সব ওষুধ নিয়ে কাজ করবা, তোমার উচিত ছিল রন্ধনশিল্পে পড়াশোনা করা। হা হা।
ফারিয়াও হাসতে থাকে, রান্নার প্রশংসা করলে দারুন খুশি হয় মেয়েটা।
অর্পি ক্যামন আছে? খুব তরল গলায় ফারিয়া হঠাৎ প্রশ্ন করে । প্রশ্ন শুনে আমি ভূত দেখার মত চমকে উঠি।
কোন অর্পি?
কোন অর্পির কথা বলছি তা তুমি ভালো ভাবেই জানো রাশেদ।
আমি খানিকক্ষণ ভাবার চেষ্টা করলাম, ব্যাপারটার একটা ভালো দিক আছে, আজকেই তাহলে পুরো সমস্যার একটা সমাধানে পৌঁছানো যাবে।
আমি যথাসম্ভব নির্লিপ্ত গলায় বললাম, হুম ভালো আছে।
তারপর একটু থেমে বললাম,ওর কথা কে বলল তোমাকে?
ভেবে দেখ, তুমিই হয়তো বলেছো।
আমি?
সরাসরি বলোনি হয়তো, কিন্তু বলতে চেয়েছো নানা ভাবে, রাশেদ একটা মেয়ে একটা ছেলের চেয়ে এসব অনেক ভালো বোঝে, বোকা সেজে থাকাটাই কখনো আমাদের মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায়।
ফারিয়ার গলার স্বরে অচেনা কর্তৃত্ব, আমি বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। তারমানে ও আমার ফেসবুক অ্যাক্টিভিটির বেশ ভালোমতই খোঁজখবর রাখতো।


ফারিয়া তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও।
ফারিয়া অন্যদিকে চেয়ে রইলো। আমি বিব্রত বোধ করতে থাকি।
জানো রাশেদ, তোমার উপর আমার খুব রাগ করা উচিত ছিল, অথচ মাথাটা এমন গেছে যে সারাক্ষণ মনে হত আমারই হয়তো কোন... কথাটা শেষ না করে থেমে গেল ও । শেষের দিকে গলাটা কেমন ধরে এল।
চল উঠি। আমি যথাসম্ভব নির্লিপ্ত গলায় বললাম।
বসো, আরেকটু।
বসে কোন লাভ নেই ফারিয়া, ফাটল ধরেছে অনেক আগেই। তোমাকে জানাতে পারিনি, তবে তোমার কোন দোষ নেই, আমারই দোষ, ইউ ডিজার্ভ আ গুড ফেলো, আমি একটা কালপ্রিট! আমি অপরাধী কন্ঠে বলি। যদিও ভিতরে তেমন কোন অপরাধবোধ কাজ করছিলো না।

আমি কি ডিজার্ভ করি জানি না রাশেদ। তবে আমায় ছেড়ে অন্যকারো হাত ধরবে এটা হয়তো কখনোই ডিজার্ভ করি না।
আমি এবার খেপে উঠি, এসব সস্তা ডায়লগ দিও না তো, তোমাকে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, তোমার সুযোগ ছিল নিজের পথটা খুঁজে নেয়ার, সেটা তুমি নাওনি। আমি উঠি এবার।
বলে যেই উঠতে গেলাম, মাথাটা কেমন ঘুরে উঠলো। হঠাৎ মনে হল চারপাশটা কেমন গুলিয়ে উঠছে, মাথা সোজা করে রাখতেই খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি বেঞ্চের হাতল ধরে বসে পড়লাম।
ফারিয়া সাথে সাথে আমাকে জড়িয়ে ধরলো আলতো করে,না না, এখনই উঠে না। তুমি একটু শুয়ে থাকো। বলে ও আমাকে বেঞ্চে ধরে একপাশে শুইয়ে দিল, মাথাটা ওর কোলে টেনে নিল।
কিচ্ছু হবে না, তুমি চুপ করে শুয়ে থাকো লক্ষ্ণীটি।
কী ব্যাপার, আমার মনে হচ্ছে গায়ে একটুও শক্তি নেই।মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে, হাতে পায়ে দারুন এক অবশতা।

তুমি রাগ করো না রাশেদ। নিজেকে অনেক ভাবে বুঝিয়েছি। তোমাকে ছাড়া বাকী জীবনটা পার করবো কিভাবে সেটা আমি কোনভাবেই মেলাতে পারছিলাম না। একসময় যখন বুঝতে পারি তোমাকে আমি আর ফেরাতে পারবো না তখন আর পাঁচ-দশটা মেয়ের মত আমিও ভেবেছি এই সীমাহীন দু:খ নিয়ে জীবনটাকে বয়ে বেড়ানোর কোন মানে হয় না। কাজটাও আমার জন্য খুব সহজ ছিল, সায়ানাইডের কয়েকটা দানা আমাদের ল্যাব থেকে নিয়ে এসে রুমে রেখে দিয়েছিলাম অনেক আগে।
কিন্তু জানো খেতে গিয়ে সাহস হয় নি যে তা না, তোমার কথা ভেবেই আমি খেতে পারি নি। আমার শুধু মনে হত খবরটা শুনে তুমি কি কষ্টটাই না পাবে, কী পাগল আমি দেখোতো, আমার বুড়ো একটা বাপ আছে, যার পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অবলম্বন আমি, মাটাও এখনও প্রতিদিন মুখে তুলে খাইয়ে দেয়, ছোট একটা ভাই আছে, এমন ন্যাওটা আমার, সব কিছু আমাকে জিজ্ঞেস করে করে। অথচ এদের কারো কথাই আমার মাথায় আসলো না। আমার শুধু মনে হচ্ছিল আমি যদি মরে যাই তাতে কি কষ্টটাই না তুমি পাবে। তুমি যে অল্পবয়সী একটা মেয়ের সাথে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়াচ্ছো সেটা আমার কাছে কিছু মনেই হয় না। সব বুঝেও আমি তোমার জন্য অন্ধ হয়ে বসে রইতাম বিষ হাতে নিয়ে।
ভালবাসাটা এমন অদ্ভুত কেন বলোতো, মনে হয় যেন জীবনটাই পাল্টে গেল। তুমি প্রথম যেদিন হাত ধরেছিলে, সেই ভাল লাগার অনুভূতি আমার আজও মরে নি, কেন এত ভালো লাগা জানো? উত্তরটা আমি অনেকদিন খুঁজেছি, আমি তোমার মত অত বইটই পড়ি না, পড়লে হয়তো আগেই জানতাম। বিষের বোতল হাতে নিয়ে একদিন আমি উত্তরটা খুঁজে পাই জানো, আসলে অন্য কিছুই নয়, আরেকটা মানুষ-ভালো লাগা মানুষ, যার সাথে হয়তো কোনদিন কোনধরনের বন্ধন ছিল না, সে হঠাৎ করে সারাক্ষণ আমাকে নিয়ে ভাবছে, স্বপ্ন দেখছে, আমার হাসি কান্নার সত্যিকারের অংশীদার হচ্ছে-একজন সাধারণ মানুষের জন্য এরচেয়ে বড় পাওয়া আর নেই। সে অনুভূতিই ভালবাসা সবচেয়ে স্বর্গীয়, মোহনীয় ব্যাপার।
সেটা আমার আজও যায় নি জানো, তবে আমার বড্ড ভয় হয়, আমার এ অনুভূতিটা খুব শীঘ্রই মরে যাবে, আর কি জানো, সেদিন লক্ষ্য করলাম এই অনুভূতির মৃত্যুর ভয়টা তোমাকে হারানোর ভয়ের চেয়েও তীব্র। আমার কিছুতে তোমার কিছু যায় আসে না এই ব্যাপারটা আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব না। তাই আমার হাতে আর কোন উপায় ছিল না।
আমি এক ধরনের বিস্ময় আর ভীতি নিয়ে আমার প্রেমিকার কথা শুনতে থাকি। ও কি প্লান করেছে আজকে! আমার হাত পা পুরোপুরি অবশ হয়ে গেছে, একটা বোবা অনুভূতি সারা শরীর জুড়ে। মাথাটা এত হালকা লাগছে, মনে হয় ভেসে বেড়াচ্ছি।

ফারিয়া আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
কিচ্ছু ভেব না তুমি, তুমি একটুও কষ্ট পাবে না। আমি কি তোমাকে কষ্ট দিতে পারি লক্ষ্ণীটি! ফারিয়া আদুরে গলায় বলল, বার্বিচুরেট টাইপ কিছু কেমিক্যাল সাবস্টেনসের একটা পার্ফেক্ট কম্বিনেশন, আমি আমার এতদিনের পড়াশোনার সমস্ত জ্ঞান দিয়ে, ঘন্টার পর ঘন্টা অথেন্টিক বইপত্র ঘেটে, ল্যাবে কাজ করে পার্ফেক্ট এই কম্বিনেশনটা বের করেছি, যাতে তুমি এতটুকু কষ্টও যেন না পাও।
আমাকে নিয়ে ভেব না, আমি হয়তো ভাল থাকবো না আগের মত, কিন্তু জানো, জীবনটা পার করে দিতে পারবো দু:খবিলাস করে, কিন্তু হৃদয়ে কোন জ্বালা থাকবে না,তুমি আমার হয়েই রইবে আজীবন-আমি আর কিছু চাই না, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
তুমি ঘুমাও, সোনা আমার। তোমার মাথায় বিলি কেটে দিই। তুমি আরাম করে ঘুমাও।

আমার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে, ফারিয়া, আমার বোকাসোকা সারল্যে ভরা প্রেমিকা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আরো কি কি যেন বলতে থাকে, বুঝতে কষ্ট হয় আমার, সমস্ত শব্দ কমে যেতে থাকে, মনে হচ্ছে মৃদু লয়ে ফারিয়া কোন গান গাইছে আর আমার দিকে চেয়ে আছে গভীর ভালবাসা নিয়ে।

আহা, কী মমতাময় সে দৃষ্টি!


Comments