বাচ্চাদের হুমায়ূন আহমেদ



আমাদের দেশে বাচ্চাদের জন্য, মানে সদ্য স্কুলে যেতে শুরু করা থেকে ক্লাস ফাইভ-সিক্স পর্যন্ত পড়ুয়া বাচ্চাদের জন্য ভাল লেখার যে খুব আকাল, এটা সবাই মানে। আর আমাদের বড়বড় লেখকরাও ভারী ভারী লেখা লিখতে লিখতে ভুলে যান সদ্য দাঁত পড়া,স্কুলের ব্যাগ কাঁধে বওয়া বিরাট এক পাঠক শ্রেণী বসে আছে একটা গল্প শোনার জন্য- ক’দিন আর মায়ের মুখের রাজকন্যা-রাজপুত্রের গল্প ভাল লাগে! বাবাদের তো কথাই নেই, গল্প বলতে গিয়ে মাঝপথে ভুলে বসে থাকে এতক্ষণ কী কী বানিয়ে বানিয়ে বলেছেন। তাই হোমওয়ার্ক শেষ করে ওরা বসে বসে ডোরেমন দেখে, বিদেশী ওয়াল্ট ডিজনীর লিটল মারমেইডে মজে থাকে।
এই দশ-বারো বছরের নীচের বাচ্চাদের জন্য লেখাটা বেশ কঠিন, তাই এদের জন্য ভালো লেখা লিখতে পারা লেখক বিরল । আমার মতে এই পাঠক শ্রেণীর জন্য গল্প-ছড়া লিখিয়ে নেয়া উচিত দেশের সবচেয়ে সেরা লেখকদের দিয়ে, কারণ শিশুসাহিত্যের মত সার্বজনীন সাহিত্য কর্ম ক’টাই বা আছে! ভাল মানের শিশুতোষ গল্প পড়ে আনন্দ পায় সব বয়েসীরা ।
বাচ্চাদের জন্য এইরকম গল্প উপন্যাস হুমায়ূন আহমেদ কেমন লিখেছেন? জবাবটা হল- খুব বেশি না, সাকুল্যে তিনশ- সাড়ে তিনশ পৃষ্ঠার এক বইয়ে হয়তো তার বাচ্চাদের জন্য লেখা সব গল্প এঁটে যাবে। ব্যাপারটা ভাবলেই বেশ খারাপ লাগে। মনে হয়- আহা, যদি আরো অনেক গল্প উপন্যাস লিখে যেতেন তিনি, কী ভালোই না হত! কত কত ছেলেমেয়ের শৈশব দারুন সব জাদুকরী গল্পে ভরে থাকতো। গল্পগুলো পড়লে সে আফসোস আরও বেড়ে যায়।
তিনি লিখেছেন একদমই অন্যরকমের রূপকথা, ‘তোমাদের জন্য রূপকথা’। যে সব রূপকথায় কোন রাক্ষস-খোক্ষস নেই, রাজপুত্রের তলোয়ারবাজী নেই, সাপের মাথায় মণি নেই, রাজা-রাজড়াদের গল্পও তেমন নেই। আছে একদম সাধারণ মানুষদের নিয়ে গল্প। একটা ছোট্ট মেয়ে ঘুম ভেঙে দেখে তার ঘরে এক পরী-সেটা নিয়ে গল্প, এক জনের আদরের নীল হাতী একদিন আর একটি বাচ্চা বায়না ধরে নিয়ে যায়-সে গল্প।
হুমায়ূন আহমেদের শিশুতোষ গল্পের একটা বেশ বড় বৈশিষ্ট্য হল এখানে সদ্য পড়ুয়াদের ভয় পাওয়ার মত বিষয়গুলোকে একদমই নিরীহ আর আপন করে উপস্থাপন করা হয়। তাই পাঠকরা ভয় পাওয়ার বদলে ভালবাসতে শুরু করে কানী ডাইনীকে। সে যখন বাচ্চাদের ধমক দেয়- মন্ত্র দিয়ে পাথর বানিয়ে ফেলবে, তাতে কেউ ভয়তো পায়ই না বরঞ্চ হাসি ফোটে মুখে।
তার গল্পের ভূতগুলো নিজেরাই ভীতু, নয়তো লাজুক। ‘মিরখাইয়ের অটোগ্রাফ’ গল্পে যেমন দেখা যায় এক ভূত ভয় দেখানোর পরীক্ষায় পাশ করতে পারে না বলে নীতুর বড় মামা’র কাছে এসে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। তখন তিনি ইচ্ছা করেই ভয় পাওয়ার অভিনয় করেন। আরেক গল্প ‘বোকাভূ’ তেও এমন এক ভূত থাকে যার মানুষকে ভয় দেখাতে ভাল লাগে না, সেটা নিয়ে তার ভূত বাবার দুঃশ্চিন্তার সীমা থাকে না।এসব ভূতকে ভাল না লেগে পারা যায় না। দৈত্য নিয়েও এমন এক গল্প আছে- ‘বোকা দৈত্য’ । সেখানে দৈত্যকে ভয় পাওয়ার বদলে নিদারুণ এক মায়া তৈরি হয় সেটার জন্য।
হুমায়ূন আহমেদের যাবতীয় লেখারই একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ঘটনার গতি প্রকৃতি স্বাভাবিক নয়, স্বভাবতই যা করার কথা তা কেউ করছে না, স্বভাবতই যা হওয়া উচিত সেটা হয়তো হচ্ছে না। এটা যদিও অধিকাংশ গল্পকারের গল্পেই থাকে, কারন যা স্বভাবতই ঘটে থাকে তা বলবার জন্য কেউ আসর জমিয়ে বসে না, তারপরও অনেক উপন্যাসিকের তুলনায় হুমায়ূন আহমেদের লেখায় ব্যাপারটা অনেক বেশি। এই ফ্যানসিফুল টুইস্ট তার শিশুতোষ গল্পগুলোতেও ছিল। তাই দেখা যায় তার গল্পে আলাদীনের চেরাগ পেয়ে দরিদ্র স্কুল শিক্ষক অভাবেই দিন কাটান- পরশ পাথর পেয়েও তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন। আরেক গল্পে বাবলুও তার প্রদীপের দৈত্যের কাছ থেকে কিছুই আদায় করে নেয় না।
হুমায়ূন আহমেদের গল্প-উপন্যাসের শেষ করা নিয়ে পাঠকের ভিতরে একধরণের অতৃপ্তি থাকে, কারন অনেককেই আমি বলতে শুনেছি- তাঁর গল্পটা এমন এক জায়গায় শেষ হল, ঘটনাটা পরিণতি পেল না। যদিও এ ধরনের এন্ডিং আসলে এক ম্যাচিউরড স্টাইল, তবে বাচ্চাদের গল্পে এ স্টাইলটা বজায় রাখা যায় না। কারণ ক্ষুদে পাঠকদের এ ধরণের পরিণতি উপভোগ করার যোগ্যতা থাকে না । হুমায়ূন আহমেদের বাচ্চাদের জন্য লেখাগুলোতে তিনি তাই তাঁর এ ধরণের এন্ডিং সচরাচর টানেন নি। ‘মোবারক হোসেনের মহাবিপদ’ ধরণের কয়েকটা গল্প আছে যেগুলোতে এ ধরণের এন্ডিং আছে। যেগুলো আমার মতে শিশুতোষ গল্পের এন্ডিং নয়।
আমাদের দেশে যারা ছোটদের জন্য লিখেছেন তাদের লেখাগুলো খুব বেশি উপদেশমূলক, যা আমার মতে ভালো শিশুসাহিত্যের প্রধান অন্তরায়। শিশুরা সরাসরি উপদেশ গ্রহণ করতে রাজি না, এমনিতেই বাবা-মা তাদের নানা ধরণের উপদেশ বাক্যে জর্জরিত রাখেন। সেখানে গল্পের ভিতরেও প্রত্যক্ষ উপদেশ তারা ভালো চোখে দেখবে না- এটাই স্বাভাবিক। ব্যাপারটা বোঝা যায় একই পরিবারের বাংলা শিশু সাহিত্যের তিন যুগের তিন দিকপাল উপেন্দ্রকিশোর -সুকুমার-সত্যজিৎ রায় এর লেখা বিবেচনা করলে। উপেন্দ্রকিশোরের লেখা দারুণ উপদেশময় ছিল, সুকুমার রায়ের গল্পগুলোতে তার সামান্য অবশিষ্ট ছিল, আর সত্যজিৎ এ ব্যাপারে সবচেয়ে সফল ছিলেন। তাঁর গল্পগুলো পুরোপুরি উপদেশমুক্ত। এ প্রেক্ষাপট থেকে হুমায়ূন আহমেদের শিশুতোষ গল্পগুলো দারুণ সফল, সরাসরি ধরে বেঁধে কোন উপদেশ নেই। কিছু গল্পে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কিছু উপদেশ আছে যেমন, রাণী কলাবতী গল্পে অহংকার করার জন্য তাকে ভুগতে হয়, বনের রাজা গল্পে শিয়ালকে দুষ্টুমির সাজা পেতে হয়।
তাছাড়া আমাদের বাংলা শিশুসাহিত্যে মামা,চাচা, দাদা ( বড় ভাই) বা একটা শিশু বা কিশোর দলের তাদের চেয়ে বড় বয়সী কারো প্রভাবযুক্ত গল্প বেশ প্রচলিত, টেনিদা যেমনটা, লেবু মামা যেমনটা। এই প্রচলিত শিশু-কিশোর গল্পের ফর্ম্যাট থেকে তার অধিকাংশ গল্প মুক্ত, অল্প কিছু অবশ্য আছে। সেগুলোতেও অবশ্য বড়রা প্রভাবক নয়।
পশুপাখি বা পোকামাকড় নিয়ে, মানে যেখানে মানুষের উপস্থিতি নেই বললেই চলে এমন কয়েকটা অসাধারণ গল্প আছে হুমায়ূন আহমেদের। ‘পিপলি বেগম’ এমন একটি গল্প। মশাদের নিয়েও এমন একটা গল্প আছে ‘এক ভয়ংকর অভিযানের গল্প’। তাঁর আর একটি অসাধারণ গল্প ‘ এ কী কাণ্ড’, পুরোপুরি কাল্পনিক একটি প্রাণী নিয়ে দারুণ একটি গল্প।
সব মিলিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সব শিশুতোষ গল্পই আশ্চর্য জাদুকরী, তাঁর গল্পের প্রতিটি চরিত্র অদ্ভূত সুখী চরিত্র, নেগেটিভ চরিত্রের বালাই নেই বললেই চলে। এটা আমার কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, কারন আমাদের দেশে শিশুদের জন্য লেখা আরেক সাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবাল এর শিশুতোষ গল্প এই দোষে কিছুটা দুষ্ট, প্রচুর নেগেটিভ ক্যারেক্টার থাকে।
আরেকটা বৈশিষ্ট্য না বললে হুমায়ূন আহমেদের ছোটদের গল্প আলোচনা অসমাপ্ত থেকে যাবে। তাঁর বড়দের উপন্যাসে তিনি পাঠকদের নানা হাহাকারের মুখোমুখি করেছেন। তাঁর উপন্যাস পড়ে বুকের নিবিড় গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরোয়নি, এমন বাঙালি পাঠক পাওয়া যাবে না।শিশুতোষ গল্পে তার এ লেখনী অন্যভাবে এসেছে।
‘ভূতমন্ত্র’ গল্পে ভূতের রাজার ছেলে বাবলুকে অদৃশ্য হবার মন্ত্র, যেকোন খাবারকে মজার খাবার বানানোর মন্ত্র বা কঠিন অংককে সহজ বানানোর মন্ত্র শেখাতে চায়, কিন্তু বাবলু রেগে গিয়ে কিছুই শোনে না, অনেক অনুনয় করেও তাকে মন্ত্রগুলো খাতায় লেখানো যায় না। কিন্তু চলে যেতেই বাবলু বোঝে মন্ত্র আসলেই আছে। ইশ! কেন লিখে রাখলো না- এই আফসোসে পাঠকের মন ভারী হয়ে যায়।
তার আরেক গল্পে বোকা এবং ভালো দৈত্যকে তার বাবা-মা গভীর সমুদ্রে ফেলে দেয়, মনে আছে এই গল্পগুলো পড়ার সময় কী কষ্টই না লেগেছে। একই ব্যাপার ঘটে সেই দরিদ্র শিক্ষকের জন্য, যার হাতে ছিল পরশ পাথরের মত নিমিষেই অভাব-দৈন্য দূর করার মত বস্তু, কিংবা পানির উপর দিয়ে হাঁটতে পারা এক লোকের জন্য- যে এ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জীবনে মাত্র একবারই পানিতে নেমেছে।
আজ হুমায়ূন আহমেদ নেই। এই না থাকাটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য এটাও যে - আমাদের দেশের শিশুরা তাদের জন্য মনোমুগ্ধকর আর মন-ভুলাইয়া গল্প বলতে পারতেন এমন কাউকে হারিয়েছে - যার অনেক গল্পই হয়তো ঝুলিতেই রয়ে গিয়েছিল, বের করে দিয়ে যেতে পারেন নি।
এ আফসোসও তার গল্পের মতই আমাদের বুকে নিদারুণ এক হাহাকার তৈরি করে যাবে আজীবন।

Comments