নিমিদের শহরে কোলা মিয়া ও রাজকুমারী রাতাতা ( পর্ব ১ )




কোলা মিয়ার আজ খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে, দিনকে দিন জলার পদ্মপাতা কমে যাচ্ছে। তার চেয়েও বড় কথা, যেগুলো আছে সেগুলোও ঠিকমতো ওর ভার বইতে পারে না। হয়তো আয়েশ করে কোনো এক নরম পাতায় কিছুক্ষণ ঝিমোচ্ছে, অমনি দেখা গেল পাতাটা মাঝখান দিয়ে দেবে যাচ্ছে আর একটা পাশ হঠাৎ করে ভাঁজ খেয়ে গলগল করে পানি উঠে পা’টা দিল ভিজিয়ে, কি বিচ্ছিরি ব্যাপার!
আর তখন যদি আশেপাশে কেউ থাকে তাহলে ভারি লজ্জার ব্যাপারও।
যেমন সেই দিনই, এমনটা যখন হল, পাশেই জলে-ডোবা হিজলের ডগায় বসে ছিল ঝিমঝিম, পাতায় পানি উঠতেই কোলা মিয়াকে বলল,
‘তুই যে একটা হাতি এটা তুই জানিস?’
‘কেন?’
‘আবার জিজ্ঞেস করছে কেন? নইলে অত বড় পাতাটা দেবে যায়?’
‘অত বড় কই, একদমই ছোট, ভুলে বসে পড়েছিলাম।’
‘হয়েছে, আর বলতে হবে না, তুই হাতিই জেনে রাখ! অত অত খেলে তো হাতি হবিই!’
শুনে কোলা মিয়ার খুব মন খারাপ হল, সে কি আসলেই মোটা হয়ে যাচ্ছে? তাহলে তো ভারি মুশকিল। ওদিকে এত লজ্জার কথাটা ঝিমঝিম পুরো জলা চাউর করছে গান গেয়ে-
‘কোলা মিয়া, কোলা
হচ্ছে এমন ফোলা
পদ্মপাতায় বসলে পরে
ঝপাস করে পিছলে পড়ে
জল হয় খুব ঘোলা
কোলা মিয়া কোলা!’
কোলা মিয়া বলল, ‘মোটেও আমি জল ঘোলা করি না, পিছলে পড়লেও টলমলেই রয়ে যায়, সত্যি!’
তখন ঝিমঝিম হেসে বলে-
‘টলমলে না ছাই
পাচ্ছে শুনে হাই
ঝপাস করে পড়লে এমন
জল হয় খুব ঘোলা
কোলা মিয়া কোলা!’

কোলা মিয়া আজকে তাই একটু বড়-সড় দেখে পদ্মপাতায় সাবধানে পা ফেলল। আশেপাশে ঝিমঝিম আছে কি না একবার দেখে নিল। কোলা মিয়ার আবার ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখা খুব সমস্যা, কারণ ওর ঘাড় খুব একটা ঘোড়ানো যায় না। ঝিমঝিম বলে বাকিদের মত ওর ঘাড়ই নাকি নেই, সত্যি কি না কে জানে!
পাতাটার পাশেই একটা পদ্মফুল, পানিতে ছাপ ফেলে নড়ছে, তাতে পাতাটাও জলের সাথে তাল মিলিয়ে এদিক-ওদিক হচ্ছে।
হঠাৎ কোলা মিয়া দেখল, পদ্মফুলের আবছা বেগুনি দাগ কাটা লালচে পাপড়িতে বসে আছে এত্তবড় এক রঙিন পাখা, রঙে মাখা।
কোলা মিয়ার পেটটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল, আর খুব খাঁই জেগে উঠল।
কি সুন্দর পাখা! খেতেও না জানি কি ভালটাই হবে।
অবশ্য কোলা মিয়া ওর লম্বা জিহ্বাটা বের করতে গিয়েও গুটিয়ে নিল।
নাহ! এমনিতেই এমন মোটা হয়ে উঠছি, এটাকে খেয়ে যদি আরো ফুলে উঠি, তখন আর কোনো পদ্মপাতাই হয়তো বইতে পারবে না, তখন কী বাজে ব্যাপার হবে সেটাও ভাববার মত। ঝিমঝিম নতুন কী গান গাইবে সেটা চিন্তা করতেই কোলা মিয়া শিউরে উঠল।
তার চেয়ে এটার সাথে আলাপ করা যাক।
‘এই যে রঙিন পাখা, কেমন আছো!’
‘ভাল আর থাকতে পারলাম কই বলো, সকালবেলা যেই না রাস্তায় বেড়িয়েছি, অমনি এক ছোট মেয়ে করল কী, আমায় ধরে পাখার নীলচে রঙটা ঘষে নিয়ে লাগিয়েছে নিজের চোখের পাপড়িতে, কেমন বাজে দেখো তো!’
‘ও, তোমার পাখায় তাহলে নীলও ছিল! সত্যিই তো খুব বাজে মেয়ে, নীলের ছিটেফোঁটাও নেই!’
‘হুম, ভীষণ পাজি!’
‘তাতে অবশ্য তুমি বেশি দুঃখ না পেলেও পারো, কারণ এখনো ওই এতগুলো রঙ আছে, সেগুলো দিয়েও তুমি খুব বাহাদুরি করতে পারবে, সুস্বাদু হবার জন্য এ রঙগুলোই যথেষ্ট।’
‘যেটা জানো না, সেটা নিয়ে কলকলিয়ো না, পাখার একটা রঙ হারিয়ে যাওয়া দারুণ খারাপ, এমনকি এমনকি...’ বলতে বলতে প্রজাপতিটা কেঁদেই ফেলল, ‘এমনকি কেউ এখন আমাকে চিনতেও পারছে না!’
‘বল কি!’
‘নয়তো কি,’ কাঁদতে কাঁদতে বলল প্রজাপতি, তারপর করুণ সুরে গান ধরলো-
‘পাখার রঙ যেই না গেল হারিয়ে
সঙ্গীসাথি, রঙিন সবাই
দিল আমায় তাড়িয়ে!’
‘কি ভয়ংকর, কেন? কেন? এতো রীতি মত রঙবাজি!’
‘না, না, আসল কথা ওরা আর আমাকে চিনতেই পারছে না, না আমার বাপ-মা, না ভাই-বোন, না আমার উড়াল-সঙ্গীরা, আমার রাজ্যের কেউ না এমনকি, ওরা বলে-
রঙেই মোরা চিনি
একই জেনো মোদের কাছে
চকের গুঁড়া, চিনি
কেরোসিন আর পানি
রেশমি, জামদানি!’
‘খুব খারাপ!’ কোলা বলল হতাশ হয়ে! ‘তারপর তারা কী করল তোমার সাথে?’
‘তারা...তারা...,’ বোঝা গেল এটা বলতে ওর কষ্ট হচ্ছে, ‘তারা আমাকে বলল আমাকে তারা চেনে না, তাই আমাকে জানে না, আমি যেন...আমি যেন মিথ্যা মিথ্যা আমাকে রাজকুমারী রাতাতা বলে দাবি না করি!’
‘মানে তুমি রাজকুমারী রাতাতা?’
‘হুম, নীল-পাখা রাজ্যের রানি আমার মা, সেই সূত্রে আর কি!’
‘আর তার মানে তোমার রানিমা, বাপ-ভাই-বোন, উড়ালসঙ্গীরা কেউ তোমাকে চিনলোই না!’
‘না!’ চোখের পানি ফেলে বলল রাতাতা।
‘এখন তাহলে কী করবে?’
‘কী আর করব, এমন হওয়ার চেয়ে মরে যাওয়াই তো ভাল, তাই ঠিক করেছি মরে যাব!’
‘ছি! এমনটা বলতে আছে?’
‘মরবোই তো!’
‘না না, এগুলো কী কথা! আর তাছাড়া মরা ভারি কষ্টের কাজ, কেউ চিনতে না পারার চেয়েও বেশি!’
‘কোথায় কষ্টের, এই এখন তুমি আমাকে খেয়ে নিলেই তো আমি মরে গেলাম! এজন্যই তো, তোমার জিহ্বার সীমানায় এসে বসেছি, যাতে গপ করে তুমি খেয়ে নিতে পারো!’
তারপর রাতাতা আবার গান ধরল-
‘আমি রঙিন পাখাও
আমাকে খাও!’
কোলা বলল, ‘পাখাও মানে কি?’
‘মানে আমি এখানে আসার আগে যে মরণ-গানটা ভেবেছিলাম সেটা ছিল-
আমি রঙিন পাখা
আমাকে খা!
কিন্তু তুমি আমার সাথে তুমি তুমি করে বলায় ছন্দটা কেটে গেছে, সেজন্য পাখা কে পাখাও করে নিলাম! হয়েছে, এত কথা রেখে খেয়ে নাও, গানটা আবার গাইবো?’
‘না, গাইতে হবে না, কিন্তু মুশকিল হয়েছে কী জানো আমারও যে একটা সমস্যা আছে, তোমাকে এখন আমি খেতে পারব না।’
‘কেন, কেন? খুব ভাল সেজেছ না! রোজ রোজ যে কত জনাকে ধরে ধরে খাও, আমাদের এক উড়াল-সঙ্গীকেও তুমি খেয়েছো, সে খবর নিয়েই আমি এখানে এসেছি। এখন খুব ভালোগিরি দেখাচ্ছ? দুঃখ পেয়ে মরতে এসেছি বলে করুণা করছো?’
‘না না, এভাবে বলছো কেন, আসলে তোমাকে খেতে আমার আপত্তি নাই, তোমাদের আগের যে জনকে আমি খেয়েছি তার চেয়ে তুমি কম সুস্বাদু হবে না তা আমি ঢের জানি, কিন্তু...কিন্তু...’
‘আবার কিন্তু কী? পেটে সমস্যা?’
‘তাও না!’
‘এমন কোনো দলে যোগ দিয়েছো যারা রঙ খায় না?’
‘না, না। এসব দলে আমি নেই।’
‘তবে?’
‘বলতে লজ্জা লাগছে!’
‘এক কাজ করো, গান গেয়ে বলো, লজ্জা কম লাগবে।’
‘সত্যি?’
‘হ্যাঁ, দুই চার ছয় সত্যি!’
‘এক, তিন সত্যি গেল কোথায়?’
‘আমরা আসলে বেজোড় গুনতে পারি না, পাখা দিয়ে গুনি তো, তাই জোড়ায় জোড়ায় গুনি।’
‘আচ্ছা, তাহলে গাই?’
‘গাও।’
‘আমার দিকে তাকিও না।’
‘আচ্ছা তাকাবো না।’

আমি কোলা মিয়া
কোলা মিয়া কোলা
রোজ রোজ রোজ খেয়ে নাকি
হচ্ছি আমি ফোলা!
রোদ পোহাতে যখন পদ্মপাতায় বসি
পাতা তখন যায় দেবে, আমার ওজন বেশি
খেয়ে খেয়ে হচ্ছি আমি ফোলা
কোলা মিয়া কোলা!’

‘তাহলে তো ভাবনার বিষয়!’ রাজকুমারী রাতাতা তার একটা পাখা বাঁকিয়ে চিন্তিত মুখে বলল।
‘ভাবনার বিষয় তো বটেই!’ কোলা মিয়াও সায় দিল!
‘ওজন না কমালে তো দেখছি ক’দিন পরে আর মুখই দেখাতে পারবে না, ভারি টেনশনের বিষয়!’
‘হ্যাঁ!’
‘আচ্ছা, শোনো, একটা উপায় আছে।’ রাতাতা ভেবে নিয়ে বলল।
‘বল।’
‘সেটা হল, তোমাকে খাওয়া কমালেই শুধু হবে না, করতে হবে ফিজিক্যাল একসারসাইজ!’
‘কি সাইজ?’
‘সাইজ না, ফিজিক্যাল একসারসাইজ, অনেকে এটা করে ওজন বেশি হলে। সবাই করে না, সবাই তো আর তোমার মত ওজন নিয়ে চিন্তিত না, আর তাছাড়া সবার এমন পদ্মপাতাতে বসতেও হয় না।
‘এটা কিভাবে করে?’
‘অনেকভাবেই করা যায়, যে মেয়েটা আমার রঙ লাগিয়েছে চোখে, সেই মেয়েটার দাদু রোজ করে এই একসারসাইজ, দাদুটা রোজ রোজ মেয়েটাকেও বলে করতে, কিন্তু মেয়েটা দারুণ পাজি তো, কথাই শোনে না!’
‘ভারি পাজি তো! তাহলে আমাকে শিখিয়ে দাও কিভাবে করতে হবে।’
‘কিন্তু আমি তো ভেবেছিলাম, আজকেই মরে যাব, তোমাকে শেখাতে গেলে তো রুটিনমাফিক কাজ করা হবে না, আমি আবার আমার রুটিনের ব্যাপারে খুব কড়া!’
‘এমন কোরো না, আমাকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে মরে যেও, কথা দিচ্ছি আমার ওজন যদি যথেষ্ট কমে যায় আমিই তোমাকে খেয়ে নেব!’
‘ঠিক তো!’
‘ঠিক, দুই চার ছয় সত্যি!
‘আচ্ছা, তবে চলো!’
‘কোথায়?’
‘ওই যে মেয়েটার দাদু যেখানে একসারসাইজ করে ওখানে, না দেখলে শিখবে কিভাবে, বলার সাথে সাথে দেখেও শিখতে হয়, এটাকে বলে প্র্যাকটিক্যাল লার্নিং, বুঝলে?’
‘প্র্যাকটিক্যাল? বল কি? আমি কোনো প্র্যাকটিক্যালের মধ্যে নাই, প্র্যাকটিক্যালের সিজনে তো আমরা রীতি মত পালিয়ে বেড়াই, প্র্যাকটিক্যাল করা ছেলেগুলার হাতে পড়লে আমরা শেষ!
‘আরে সেটা তো বায়োলজির প্র্যাকটিক্যাল, এটা অন্য প্র্যাকটিক্যাল।’
‘তুমি ঠিক জানো তো, নাকি ভেবেছো তোমার মত আমারও মরণে ভয় নেই। আসলে আমার কিন্তু অনেক ভয়!’
‘না না, আমি নিশ্চিত, সে ভয় নেই, চলো!’

তারপর কোলা মিয়া আর রাজকুমারী রাতাতা জলার থেকে দখিনে, যেখানে আছে একটা একটা ছোট্ট শহর, সেইদিকে রওনা হলো!

( চলবে)

অলংকরণ: মাহাতাব রশীদ
প্রথম প্রকাশ: বইমেলা ২০১৬, বই হিসেবে আলেকজান্দ্রিয়া প্রকাশনী হতে

Comments

  1. পরের পর্ব গুলো কি আর পাবো না?

    ReplyDelete

Post a Comment