ইজেল ছেড়ে বেড়িয়ে আসা একঝাঁক কালো কবুতর (পর্ব ১)


১.
আমার প্রেমিকা দাবি করেছিল আমার একটি ছিমছাম চাকুরি প্রয়োজন, নইলে সম্পর্কটা ঠিক জুতসই হচ্ছে না। ব্যাপারটা নিয়ে আমি ভাবিত হলাম, মেয়েটার উপর আমি কিছুটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি, সম্পর্কটা না টিকলে মুস্কিল। আমি বললাম, বাকিরা তো বলে আমার মাথা ঠিক নেই, ওরা যদি চাকরি না দেয়!
আলবৎ দেবে! ও আমাকে ভরসা দেয়। তোমার মাথাটা যে অমাবস্যার রাতে চক্কর দিয়ে ওঠে সেটা ওরা জানবে কিভাবে।
এটা ঠিক। এমনিতে আমি খুব ভাল মানুষ, কবিতার প্যাডে কবিতা লিখে জিন্সের প্যান্টের পিছনের পকেটে রেখে দিই আর কাউকে মনে ধরলে পাতা ছিড়ে কবিতা ধরিয়ে দেই। ব্যাপারটা দারুণ অমায়িক, এটা কয়েকজন আমাকে বলেছে। কিন্তু অমাবস্যার রাতে আমি কেমন দুলে উঠি, কবিতার প্যাডটা কেরোসিনের চুবিয়ে আগুনে দেই, ওটা যখন দাউ দাউ করে জ্বলে তখন একটা চিমটা দিয়ে ধরে প্রতিবেশী বাড়ির দাহ্য অংশে নিক্ষেপ করি। আবদুল বাতেন সাহেবের বড় মেয়ে নাজমার কামিজেও একদিন আগুন দিয়েছিলাম, মেয়েটার পয়ত্রিশ পার্সেন্ট পুড়ে গেছিলো, আর আমাকে জেল-হাজতে থাকতে হয়েছে পৌণে চারমাস। মেয়েটা দারুণ সুন্দরী ছিল, কামিজটা আরো সুন্দর ছিল।
লতিফা আমাকে পরেরদিন ভাল শার্ট-প্যান্ট পড়িয়ে চাকরি খুঁজতে পাঠাল, পত্রিকার একটা কাটিং হাতে নিয়ে নির্দিষ্ট একটা ঠিকানায় গিয়ে আমি হাজির হলাম। জায়গাটা খিলখেতের কাছাকাছি, চারতলা দালান। আমি গিয়ে রিসেপশনে বললাম, শুনুন, আমি কি আপনাকে একটি জরুরী প্রশ্ন করতে পারি?
রিসিপশনিস্ট মেয়েটা সুন্দর। চোখের চারপাশে ঘন করে কাজল দিয়েছে, তাতে চোখটার ডেপথ বেড়ে গেছে। পল্লবগুলো সুবিন্যস্ত, পাকা ধানের মাঠে হাওয়া বয়ে গেলে ধানগুলো যেমন একপাশে হেলে পড়ে তেমনি হেলে আছে। আমার মনে হল মেয়েটার চোখ-পল্লবে একটি লাল ফড়িং উড়ছে।
মেয়েটা বলল, আপনি কি আজ ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন?
আমি সেটার জবাব দিলাম না, মুখ শক্ত করে একপাশে এক চেয়ারে বসে পড়লাম। মেয়েটা আমাকে জরুরী প্রশ্ন-যেটা হয়তো ইন্টারভিউ সংক্রান্তই, সেটা করতে না দেয়ায় আমার খুব জেদ হল। আমার ইচ্ছা করছিলো তখনই দালান থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে যাই। কিন্তু তখন আমার আবার লতিফার কথা মনে পড়লো। লতিফা জামান, আমার প্রেমিকা, আমাকে খুব আগলে রেখেছে, ওর কথা না শুনলে ও আমাকে ছেড়ে যেতে পারে, তাতে আমি খুব অসহায় হয়ে যাব।
আমি আবার তাই রিসেপশনে ফিরে গিয়ে মেয়েটাকে বললাম, হ্যা আমি ইন্টারভিউ দিতে এসেছি। এটা কি নির্মলা ক্যাটারিং সার্ভিস?
মেয়েটা অমায়িক হাসল, বলল- জ্বী, এটাই। আপনি বসুন। খানিকবাদেই ডাকা হবে।
মেয়েটার চোখের পল্লবে এবার একটা কাকতাড়ুয়া দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম। কাকতাড়ুয়ার মাথায় একটা নীল হাড়ি বসানো। হাড়িতে কেউ চক দিয়ে চোখ-মুখ এঁকেছে।
আমি আমার সিটে গিয়ে বসলাম এবং লক্ষ্য করলাম আমার সাথে আরো কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী বসে আছে, এরা সবাই নিশ্চয়ই আমার লতিফা জামানের অনুগ্রহ প্রাপ্তিতে আমার প্রতিযোগী। আমার বামপাশে বসে আছে এক শীর্ণকায় যুবক, শার্টটা সস্তা, বহুবার ধোয়ায় বিবর্ণ, যুবকটি মৃদু স্বরে স্রষ্টাকে ডাকছে। এই যুবকটির চাকরি খুব প্রয়োজন সেটা দেখলেই বোঝা যায়-এর বাড়িতে নিশ্চয়ই খুব টানাটানি, চাল-ডাল জোটাতেই সমস্যা হয়, হয়তো ওর বাপ ধার-দেনায় জর্জরিত, পাড়ার মুদি দোকান এখন আর বাকিও দিতে চায় না, হয়তো ওর বাড়িতে এখন একবেলা হাড়ি চড়ে, ওর নিশ্চয়ই ছোট-ভাইবোন আছে-যারা ওর দিকে চেয়ে আছে যে একটা চাকরি পেলে খিদেয় আর কষ্ট করতে হবে না। লতিফা জামানের অনুগ্রহ প্রাপ্তির প্রতিযোগীতায় আমি এমন প্রতিদ্বন্ধী চাই না।
এই যুবকটির পাশে বসে আছে একটি কিশোর ছেলে। ছেলেটা অস্থির, এদিক ওদিকে তাকাচ্ছে, কানে একটা হেডফোন গোজা, হাতের মুঠোফোনে ফেসবুক ব্রাউজ করছে, টুং করে একটা আওয়াজ হল, মনে হয় কেউ মেসেজ করেছে- ছেলেটার মুখে দেখা গেল বাঁকা হাসি। আমার মনে হল, ছেলেটা ধুরন্ধর, ওর বাপ-মা কলেজের পড়াশোনা করতে বলে নিয়মিত কিন্তু পড়তে ওর ভাল লাগে না। এই নিয়ে রোজ হাঙামা হয় বলে ও বাড়ি ছেড়ে পালানোর ফন্দি করছে, এ সময় একটা চাকরি জুটে গেলে ওর পোয়াবারো, বুড়ো-বুড়িকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সটকে পড়া যাবে, ওর নিশ্চয়ই অল্পবয়সী কোন প্রেমিকা আছে, যে রোজ পালাতে উস্কানি দেয়। লতিফা জামানের অনুগ্রহ প্রাপ্তিতে আমি এই ছেলেটিকেও প্রতিদ্বন্ধী হিসেবে চাই না।
এরপরে বিক্ষিপ্তভাবে আরো কয়েকজন বসে ছিল। তাদের আমি ভালমত লক্ষ করতে পারলাম না, কারন নিখুঁতভাবে দেখার মত দূরত্বে তারা কেউ ছিল না।
এরপর একজন একজন করে ডাক পড়তে লাগলো। আমার সিরিয়াল পিছনের দিকে ছিল, তাই আমি বসে বসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ভাবছিলাম। আমার ভাবনার বড় অংশ, প্রায় সত্তরভাগ জুড়ে অবশ্য লতিফা জামানই থাকে, তারপরও বাকি ত্রিশ ভাগ ভাবনা আমি ভেবে রাখি নিয়মিত। যেমন, আমি আমার মাথায় তৈরিকৃত দ্বীপ অরোরা ল্যান্ড নিয়ে ভাবি। অরোরা নামটা কেন আমার মাথায় আসলো সে সম্পর্কে আমার ধারণা নাই। তবে এই দ্বীপটা আমি তিলে তিলে তৈরি করেছি। দ্বীপের প্রত্যেকটা ঘর আমার নিজ হাতে তৈরি। দ্বীপে কিছু মানুষ ও পশুপাখি আছে,বৃক্ষ আছে। সেগুলোও আমার আমদানি করা। যেমন গত মার্চ মাসে আমি উপকূলে পাইন গাছ লাগিয়েছিলাম, সেগুলো এখনো বড় হয় নাই। নার্সারির লোকটা আমাকে বলেছে পাইন গাছ বড় হতে একবছর লাগে।
আমার এই দ্বীপটার কথা লতিফা জানে, আর কেউ জানে না। আমার স্কুলের এক বন্ধু জানতো, নাম মিফতাহ। মিফতাহর সাথে দেখা হলে ও দ্বীপের ঘরবাড়ি ওলট পালট করে দিত, বলতো- দ্বীপের মাঝখানে একটা মিঠা পানির হাওর রাখ, তাহলে ভাল হবে। হাওরের পাড় ঘেষে বৈচির ঝোপ-জলে মেঘের ছায়া আর শাপলা পাতা, হাওয়া উঠলে পানি কাপে তিরতির করে। মিফতাহ এমন করে বলতো যে আমি না চাইলেও দ্বীপে হাওরটা বসে গেল। এইভাবে নানা কিছু পরিবর্তন করছে ও। গত বছর বাস এক্সিডেন্ট করে মারা যায় মিফতাহ। তখন আমি স্বস্তি পেয়েছিলাম, কারন দ্বীপটার কথা আর কেউ জানুক এটা আমি চাই না। লতিফা জানলেও লতিফা দ্বীপ নিয়ে মাথা ঘামায় না। শুধু একদিন বলেছিল, ‘আমারে রাইখো তোমার দ্বীপে!’
আমি রাখি নি। কারন আমার দ্বীপের বাসিন্দারা কেউ বাস্তব জগতে জীবিত না। এটা অবশ্য লতিফা জানে না। যেমন মিফতাহ মারা যাবার পরদিন মিফতাকে আমি দ্বীপের একটা ঘর দিয়েছি, তাতে ও খুশি হয়েছে। এমনি করে আমার বাপ-মা, ছোটভাইও দ্বীপের বাসিন্দা। আমি ওদের সবচেয়ে ভাল ঘরটায় রাখছি, কারন আমি ফ্যামিলি ম্যান, ফ্যামিলি আমার কাছে সবার আগে।
দ্বীপ নিয়ে ভাবনায় ছেদ পড়লো, সুন্দরী রিসিপসনিস্ট আমাকে বলল, আপনার ইন্টারভিউ শুরু হবে এখন, আপনি ওই রুমে যান।
আমি রিসিপসনিষ্ট এর চোখের পল্লবে এবার জারুলফুলের ঘন স্তবক দেখলাম, এই মেয়েটার চোখটা খুব চঞ্চল, খানিক পরপরই পাল্টে যাচ্ছে।

ইন্টারভিউ বোর্ডে দুইজন বয়স্ক লোক আর একজন বয়স্ক মহিলা ছিলেন। তারা আমার সম্পর্কে নানা কথা জিজ্ঞেস করলেন। আমার মনে হল তাদের আগ্রহ সীমাহীন। আমি কেন ফাইন আর্টসে একবছর পরে আর পড়াশোনা করিনি সেটা নিয়ে তারা বিশেষ উৎসুক হলেন। আমি তাদের কারনটা বললাম। তারা মেনে নিলেন। নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে কথা বললেন। আমি যে শুধুমাত্র একটা ছবিই একহাজার সত্তর বার এঁকেছি ব্যাপারটায় তারা হয়তো কিছুটা বিস্মিত হয়েছে এবং এই কারনেই ফাইন আর্টসের টিচাররা আমাকে রাখতে রাজি হয় নাই এটায় তারা হয়তো বিস্মিত হয় নাই। কিন্তু আমার মতে দ্বিতীয় কথায় তাদের বিস্মিত হওয়া উচিত ছিল। আমার মতে, একজন আর্টিস্টের একটা ছবিই আঁকা উচিত নানা ভাবে, হাজার হাজার ছবি এঁকে কি লাভ।
তারা আমার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তারা যে সবাই সমুদ্রপাড়ে ট্যুরে ঘুরতে গিয়ে মারা গেছে এটা জেনে তাদের মুখে সামান্য ভাবান্তর হল। আমার পরিবারের মধ্যে কেবল আমি বেঁচে গেছি এটা জেনে তারা বিব্রত হল ।
এরপর তারা আমাকে তাদের কাজের ধরণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিলেন এবং সেসব আমি করতে পারবো কিনা জানতে চাইলেন। আমি কাজটা পছন্দ না করলেও মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম যে কাজটা আমি পারবো। এরপরে আমার ইন্টারভিউ শেষ হল। আমি দালান থেকে বেড়িয়ে লতিফার ফ্লাটের পথ ধরলাম।

( চলবে)

No comments:

Post a Comment