গল্প: চানাচুর বিষয়ক গবেষণা

আমি একজন সামাজিক গবেষক, বিবিধ আমার গবেষণার বিষয়-আশয়। আমার যিনি সুপারভাইজার, তিনি প্রখ্যাত গবেষক, তার গবেষণার ছোটখাট বিষয়াদি নিয়ে আমি স্বত্যন্ত গবেষণা করে থাকি ফাকেঁ জোকে। সম্প্রতি তিনি আমাকে মানবিক আচরণ ব্যাখ্যায় চানাচুরের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করতে বলেছেন, তিনি আমার আরেক সহকর্মীকে লইট্যা শুটকির প্রভাবের কথা বলেছেন। তবে আমি খুশি যে আমার ভাগে চানাচুর পড়েছে, আমি চানাচুরের কিছুটা ভক্ত। এই নতুন গবেষণার ব্যাপারটা বলবার পর থেকে আমার সুপারভাইজারের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। কী অসাধারণ তার প্রজ্ঞা, কতই না ঋদ্ধ- বিদগ্ধ তিনি। এটা নিয়ে এতদিন কেন গবেষণা হয়নি সেটা ভেবে আমি আশ্চর্যান্বিত হলাম।

তিনি গবেষণার ব্যাপারে কয়েকটি হিন্টস দিয়েছেন আমাকে। বলেছেন- লক্ষ রাখবে, যে লোকটি সামনে পেয়েও চানাচুর খেল না, সে সংযমকারী বা স্বাস্থ্য-সচেতন। জানো তো চানাচুর পেটের জন্য অতটা ভাল না।
কথাটা বলার সময় অবশ্য আমরা দু'জনাই মুঠ মুঠ চানাচুর চিবোচ্ছিলাম। সাতক্ষীরার বলরামপুরের করিম শেখের নিজের হাতে বানানো চানাচুর, চানাচুরের বাদামও তার নিজ ক্ষেতের, বঙ্গপসাগরের লবণে ভাজা। গবেষণার জন্য ত্রিশ কেজি আনা হয়েছে অর্ডার দিয়ে, আমরা সেটা যাচাইও করছিলাম বলা যায়।
তিনি আবার বললেন, চানাচুর খাবার সময় যে লোকটি বাদাম বেছে খেয়ে নিল, সে স্বার্থপর।
আমার হাতে তখন দুটো বাছা বাদাম ছিল, আমি বুড়ো আঙ্গুল কনিষ্ঠ আঙ্গুলের দিকে প্রসারিত করে বাদামদুটো গুজেঁ ফেললাম।
চানাচুরের সাথে আমার বস একদুই চুমুক হুইস্কি খাচ্ছিলেন। আমার হাতেও এক গেলাশ ছিল, আইস দেয়া। কিন্তু খাচ্ছিলাম না, কারন নেশা হলে আমি খুব গালিগালাজ করি, প্রধান গবেষককে গালি দিলে তিনি চাকরি থেকে খেদিয়ে দিতে পারেন, তখন আমার বুড়ো বাপ আর মা, আর সুন্দরী স্ত্রী নিয়ে আমি বড় বিপদে পড়ে যাব।
তিনি আবার বললেন, চানাচুর মুঠ মুঠ করে খাওয়া ছোটলোকি।
আমি আমার মুঠোতে থাকা চানাচুর প্লেটে কিছুটা রেখে সাফাই গেয়ে বললাম, স্যার, শিশুরাও মুঠ মুঠ চানাচুর খায়। আমার ছোট এক ভাই ছিল, চার বছর বয়সে বিরিশপুরের বিলের পানিতে ডুবে মারা যায়, শাপলা পাতার পাশে ভেসে উঠছিলো হাসি হাসি মুখে, সেও মুঠ ভর্তি চানাচুর খেত।
তিনি বিরক্ত হয়ে বলল, শিশুরাও ছোটলোক, এটা নতুন করে বলার কি আছে! এ বিষয়ে উননিশশো চুয়াত্তরে আমার একটা গবেষণা ছিল, স্টাডিরুমে আছে, সময় পেলে দেখো। দুর্ভিক্ষের সময় শিশুরা মৃতপ্রায় মায়ের শেষগ্রাসও কেড়ে নেয়।
কথাটায় হঠাৎ আমার পেটে পাক দেয়, কেন যেন বিবমিষা হয়।
তিনি আবার বললেন, চানাচুর যে তাড়াতাড়ি খায় সে নিরাশাবাদী!
আমি বললাম, এর ব্যাখ্যা কি?
ওই বেলা সে এরচেয়ে ভাল কিছু আশা করেনা।তাই চানাচুরে পেট ভরাতে সচেষ্ট সে।
আমি বললাম, তাহলে যে ধীরে খায় সে আশাবাদী।
তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, বাজে কথা রাখো। সে বিষাদগ্রস্থ। বিষাদের নিস্পৃহতা ছাড়া কে কবে চানাচুর ধীরে খায়!
বস হুইস্কিতে আরেক চুমুক দিয়ে বললেন-এই বেলা যাও! মতিপুরের জনপদে চানাচুরের প্রভাব প্রত্যক্ষ করে এস। এককেজি তো যাচাই করতেই খরচ হল। বাকি উনত্রিশ কেজি চানাচুর নিয়ে আজই তুমি ট্রলারে উঠবা। ঠিকঠাক সার্ভেটা করে আসো।
আমি তাকে বিদায় জানিয়ে তক্ষুনি বেড়িয়ে পড়লাম, গবেষণাটা হওয়া উচিত দ্রুত। চানাচুর কোম্পানীরা আমাদের এই গবেষণার তথ্য-উপাত্ত সোনার দামে কিনে নেবে, নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করবে। চানাচুরের ব্যাগ পিঠে নিয়ে আমি ট্রলার ঘাটে ছুটে গেলাম।



ট্রলারে করে রাত পার হয়ে মতিপুরে পৌছাই সকাল সকাল, যদিও সূর্য ওঠেনি, চারপাশে ঘোলা আলো আর কুয়াশা। গত পনেরদিন ধরে নাকি একই অবস্থা। মতিপুরে আগে একবার এসেছিলাম অন্য গবেষণায়, তখন গরুর গাড়িতে এসেছিলাম। এখন ট্রলার ছাড়া নড়বার-চড়বার উপায় নেই। স্বল্প বসনের কালো রঙা চাষাভুষা সব টিনের চালে ঘর পেতেছে। আমাকে দেখে ভাবলো, আমি রিলিফ নিয়ে এসেছি।
আমার গবেষণার স্বার্থে আমি প্রথম পরিবারকে দুইকেজি চানাচুর দিলাম এবং তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করলাম।
নোট করলাম- এই পরিবার স্বাস্থ সচেতন নহে!

আরেকটু সামনে গিয়ে দেখি এক টেলিভিশনের লোক, ঘরের চালের কালো রঙা স্বল্পবসনদের ফুটেজ নিচ্ছে, লোকটাকে আমি চিনতে পারলাম, খুব কামেল আদমী। যেখানেই স্বল্পবসন-হাড়বের করা মানুষ পাওয়া যায় সেখানেই গিয়ে গিয়ে ছবি তুলে। ট্রলার নিয়ে আমি তার ট্রলারের পাশে গেলাম এবং আমাদের আলাপ হল। আমার গবেষণার বিষয় তাকে অবহিত করলাম, তিনি উচ্ছ্বসিত হলেন। চানাচুরগুলো সাতক্ষীরার বলরামপুরের করিম শেখের নিজের হাতে বানানো আর বাদামও তার নিজের ক্ষেতের এবং বঙ্গপসাগরের লবণে ভাজা জেনে তিনিও গবেষণার স্বার্থে চানাচুর ভোজনে রাজি হলেন। আমরা তখন পরস্পরের ট্রলার পাশাপাশি রেখে এককেজি চানাচুর খেলাম। সেসময় আমি তার চানাচুর খাওয়া পর্যবেক্ষণ করলাম।
নোট নিলাম- লোকটি স্বার্থপর এবং আনন্দিত। তার চানাচুর গ্রহণ দ্রুতও নয়, ধীরও নয়।

এরপর কোনদিকে যাব সে সম্পর্কে আমি তার সাহায্য চাইলাম। তিনি হাতে লেগে থাকা চানাচুরের গুড়া কালো জিব বের করে চেটে নিয়ে বললেন, উত্তরদিকে গেলে একটা তালগাছ পড়ে। সেইটার ডানদিকে এক বিচ্ছিন্ন বেখাপ্পা বাড়ি আছে, ওইখানে কলেরায় ভুগে আর না খেয়ে বাড়ির এক মেয়ে মারা গেছে। কবর দেয়ার মত উঁচু জায়গা না পাওয়ায় তারা ব্যথিত। তাদের উপর আপনি গবেষণা পরিচালনা করতে পারেন।
আমি তার কথায় দিকপ্রাপ্ত হবার আনন্দ অনুভব করলাম এবং আমার ট্রলার নিয়ে শীঘ্রই পৌছালাম। পরিবারটিকে আমি চানাচুর দিলাম। এবং চানাচুর সংক্রান্ত তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করলাম।
নোট করলাম- এরা স্বাস্থ্যসচেতন, স্বার্থহীন এবং বিষাদগ্রস্থ।
এরপরে আমি আরো কয়েকটি পরিবারকে খুঁজে পেলাম এবং তাদের বাকি চানাচুর বিলি করে তাদের প্রতিক্রিয়া লিপিবদ্ধ করলাম।
সামগ্রিক ফলাফল দাঁড়াল- মতিপুরের অধিকাংশ পরিবারই স্বাস্থ্য-সচেতন নহে। তারা সকলেই নি:স্বার্থ। তাদের পঁচাশিভাগ ছোটলোক এবং নব্বই ভাগই নিরাশাবাদী।
আমি আমার রিপোর্ট নিয়া ট্রলারে করে ফিরতি পথে রওনা দিলাম।
ফেরার পথে, হঠাৎ মনে হল, এই মহৎ গবেষণার আমিও একটি সাবজেক্ট, আমি মতিপুরেই চানাচুর গ্রহণ করেছি। তাই আমার নামেও আমি নোট নিলাম।
-স্বাস্থ্য সচেতন, স্বার্থপর, ছোটলোক নহে, আনন্দিত।

চানাচুর জনিত আচরণবিধির এটি একটি স্বার্থক গবেষণা তা নিজের সম্পর্কে নোট নেয়ার পরই আমি হৃদয়ঙ্গম করলাম।
কারন, সফল গবেষণা সম্পন্নে আমি সত্যি ভীষণ আনন্দিত ছিলাম!

Comments