গল্প নয়, অগল্পও না••৩ মিনিট পড়া
তুমি কেমন করে জানো পাথরটার ভিতর লুকিয়ে আছে ঘোড়া
লেখক: মাশুদুল হক
শহরের শেষ প্রান্তে ছোট্ট আর মনকাড়া স্টুডিওটাতে কাজ করতো অল্প বয়স্ক এক ভাস্কর। ওর নাম আদ্রিয়ানো। আদ্রিয়ানোকে যারা জানতো তারা একবাক্যে স্বীকার করে নেবে, ওর মত ভাস্কর খুব কম জন্মেছে পৃথিবীতে। মার্বেল পাথর কেটে ও যখন বানাতো কোন মানবদেহ, অনায়াসে তা দিয়ে শারীরবিদ্যার শিক্ষার্থীদের দেয়া চলতো পাঠদান। ওর পাথরের ফুলে মৌমাছি বসতো। লোকে যেন সুবাসও পেত।
আদ্রিয়ানো খুব খামখেয়ালি মেজাজের, চাইলেও ও হতে পারতো জগদ্বিখ্যাত, হাতের কাজের বিনিময়ে পারতো পেতে সচ্ছল আর সহজ জীবন। কিন্তু কেউ দাম দিয়ে কিছু কিনতে চাইলে ওর খুব আঁতে লাগতো, বলতো-অর্থ দিয়ে আমার কাজ কেনা যায় না, হতে হয় সমঝদার। আগে বলো, কেন তোমার এই কাজ ভাল লাগছে!
এই পরীক্ষায় সবাই পাশ করতো না, তাই ওর অনেক কাজই থাকতো পড়ে।
একবার পাথর কেটে ও তৈরি করলো এক তেজস্বী ঘোড়া। সেটার কাজ অর্ধেক হতেই শহরে রটে গেল আদ্রিয়ানো কী এক মারাত্মক কাজ করছে। ছেলে বুড়ো লাইন ধরে সকাল সন্ধ্যা ওর কাজ দেখতো। বনেদি পরিবারগুলো সমঝদার হওয়ার জন্য ভাড়া করলো সুমিষ্ট বক্তাদের। হাজার স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে কেউ কেউ দোকানের বাইরে অপেক্ষা শুরু করলো।
আদ্রিয়ানো ব্যাপার দেখে একদিন বললো, কাজটা শেষ হবে কয়েকদিনেই। কিন্তু এ বিক্রির জন্য নয়। যে সত্যিকারের প্রশংসা করতে পারবে আমার কাজের, তাকে আমি বিনামূল্যে এটি দিয়ে দিব!
তারপর শুরু হলো এক অভূতপূর্ব মঞ্চায়ন, একজন করে স্টুডিওতে প্রবেশ করে আর আদ্রিয়ানোকে জানায় কেন তাদের ভাল লাগছে এই ভাস্কর্য। কেউ বললো, আদ্রিয়ানো ঘোড়াটা এত জীবন্ত, মনে হচ্ছে এখনি ওর পিঠে চড়ে আমি পৃথিবী দেখতে বেড়োই। এক শিল্প সংগ্রাহক বলল, মিকেলেঞ্জলোও তোর কাজ দেখে বিস্মিত হত! একজন বলল, তোর হাত ঈশ্বরও ধার নিতে চাইবে।
কারো প্রশংসাই আদ্রিয়ানোর মনে ধরে না। এভাবে গেল তিন দিন। কারো কপালেই বোধহয় এই ভাস্কর্যটি জুটবে না এমনটা মনে হল সবার।
কয়েকদিন পর একমনে আদ্রিয়ানো ওর হাতুড়ি দিয়ে শেষ দাগ কাটছিলো ঘোড়ায়। সেসময় এক ছোট্ট মেয়ে স্টুডিওতে ঢুকলো। স্কুল থেকে রোজ ফেরার পথে খুকিটি মায়ের চোখ এড়িয়ে কখনো ঢুকে যায় আদ্রিয়ানোর কাজের জায়গায়।
ঘোড়াটা প্রথম দেখে খুকিটি বিস্ময়মাখা কণ্ঠে চেঁচিয়ে বললো, আদ্রিয়ানো কাকু, তুমি কেমন করে জানতে পাথরটার ভেতরে লুকিয়ে ছিল ঘোড়াটা?
তাতে আদ্রিয়ানো চমকে ওঠে। অনুভব করে এক অসাধারণ গৌরব আর আত্মতৃপ্তি, যেটা বহুদিন ধরে সে খুঁজে পাচ্ছিলো না নিজের মধ্যে।
ঘোড়াটা খুকিকেই দিয়েছিলো আদ্রিয়ানো!
